শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরের ১৩টি সিমেস্টারের পরীক্ষা নিয়ে আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, এবার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (NBU) নিয়ন্ত্রণে থাকা ৫২টি কলেজ, দুই ক্যাম্পাস এবং দূরশিক্ষা- সব মিলিয়ে লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড়ো প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজকর্মের দায়িত্বে রয়েছে একটি সংস্থা। তাদের প্রাপ্য তিন কোটি টাকার বেশি বকেয়া না মেটানোয় কাজ করা সম্ভব নয় বলে আগেই জানিয়েছিলেন সংস্থার কর্তারা। মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন আধিকারিক এবং শিক্ষককে নিয়ে সংস্থার এমডি’র সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠক ভেস্তে গিয়েছে। সূত্রের খবর, বৈঠকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে সরব হন এমডি ডি মণ্ডল। তাঁর সঙ্গে কয়েকজনের তর্কাতর্কিও হয়। তারপরই তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, টাকা না পেলে পরীক্ষার কাজ তো করবেনই না, বরং ইতিমধ্যেই কলেজগুলিতে স্নাতক স্তরের যেসব পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে সেইসব পরীক্ষার ফল প্রকাশ সংক্রান্ত কোনও কাজেও তাঁরা হাত দেবেন না। কয়েকদিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দপ্তর গুটিয়ে চলে যাওয়া এবং প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ারও হুমকি দিয়েছেন তিনি (NBU examination company dispute)।
২০২৫-এর ডিসেম্বরে নয়া শিক্ষানীতি অনুসারে এফওয়াইইউজিপি পদ্ধতিতে কলেজগুলিতে স্নাতকস্তরের তৃতীয়, পঞ্চম (রেগুলার) এবং ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম সিমেস্টার (ক্যাজুয়াল)-এর পরীক্ষা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ফলাফল প্রকাশ হওয়ার কথা। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কাজ বন্ধ করে দিলে কোনওভাবেই ফল প্রকাশ করা যাবে না। পরীক্ষার পর উত্তরপত্র তাদের কাছেই জমা হয়। তারা উত্তরপত্র না দিলে সেগুলি যাচাইয়ের কাজও হবে না। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে স্নাতকস্তরের একাধিক সিমেস্টারের পরীক্ষা হওয়ার কথা। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম সিমেস্টারের পরীক্ষাও ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়ার কথা। এখন সেই পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপের সময়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কাজ বন্ধ করায় আজ পর্যন্ত কোনও কলেজেই ফর্ম পৌঁছায়নি। অর্থাৎ কলেজগুলিতে একদিকে ছাত্রছাত্রীদের ফল প্রকাশ, অন্যদিকে পরীক্ষা- সব কাজই বন্ধ।
৬ জানুয়ারি থেকে স্নাতকোত্তরের প্রথম ও তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। তার আগে তৃতীয় ও চতুর্থ সিমেস্টারের সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার হওয়ার কথা। আইনের পাঁচটি এবং দূরশিক্ষা বিভাগের চারটি সিমেস্টারের পরীক্ষারও সময় পার হয়ে গিয়েছে। সোমবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে পরীক্ষাগুলো আপাতত হচ্ছে না। কোনও রাখঢাক না রেখে সমস্যা তৈরির জন্য সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার এমডি। তাঁর কথা, ‘অগ্রিম নয়, কাজ করার পর টাকা চেয়েছি। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বলছেন, উপাচার্য না এলে টাকা দেওয়া যাবে না। কিন্তু উপাচার্য না থাকার পরও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারই আমাদের আগের বকেয়া মিটিয়েছেন। এখন হঠাৎ করে কী হল তা বোধগম্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করে জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। চুক্তি মেনেই কাজ করছি। তারপরও মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের সংস্থাকে নানাভাবে বদনাম করার চেষ্টা করেছেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্ববান আধিকারিকের এমন আচরণে আমি মর্মাহত।’
ভাস্করকে ফোন করা হলেও তিনি অবশ্য ফোন ধরেননি। জয়েন্ট রেজিস্ট্রার স্বপনকুমার রক্ষিতের বক্তব্য, ‘সংস্থার এমডি-কে কাজ চালানোর জন্য আমরা অনুরোধ করেছি। উনি ভেবে জানাবেন বলেই আমাদের জানিয়েছেন।’ তবে এমডি’র অভিযোগ নিয়ে কোনও কথা বলতে চাননি স্বপন। এসএসসি বা ইউজিসি’র পরীক্ষা পরিচালনা বা অস্থায়ী শিক্ষাকর্মীদের বেতন সমস্যা সমাধান, ভাস্কর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বারবার প্রকাশ্যে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এবার ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের প্রশ্নেও সামনে এল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা।
