রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: ইসলামপুরের মামুন শেখ গুরুতর অসুস্থ। এই অবস্থায় উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে (NBMCH) চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর পরামর্শ দেন। কথামতো তিনি পৌঁছে যান রেডিওলজি বিভাগে। কিন্তু তারপরেই মাথায় হাত পড়ে মামুনের। তাঁর আল্ট্রাসনোগ্রাফির (Ultrasonography) তারিখ পড়েছে ৪০ দিন পরে!
রিমি সরকারকে প্রসূতি বিভাগ থেকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করিয়ে রিপোর্ট দেখানোর জন্য বলা হয়। তারপরেই তাঁর চিকিৎসা শুরু হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে রিমি ওই বিভাগে যান। তাজ্জব ব্যাপার। মামুনের মতোই মাথায় হাত পড়ে রিমির। একমাস পরে আল্ট্রাসনোগ্রাফির তারিখ পেয়েছেন তিনি।
মামুন, রিমিরা হাসপাতালে দাঁড়িয়েই একসুরে প্রশ্ন তোলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য যদি এক-দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে চিকিৎসা কবে শুরু হবে? তাঁদের মতোই আরও অনেকে এ প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু জবাব মিলছে না। মিলছে শুধুই তারিখ আর তারিখ। আর এই অব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে বা বলা ভালো সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে। ফুলেফেঁপে উঠছে ব্যবসা।
এ নিয়ে কটাক্ষ শোনা যাচ্ছে হাসপাতালের অন্দরে। কেউ কেউ বলেই দিচ্ছেন ‘মেডিকেলে যদি সবকিছু সময়মতো হয়ে যায়, তাহলে বেসরকারি ল্যাবরেটরি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তারদের চেম্বার কীভাবে চলবে?’ একধাপ এগিয়ে অনেকে এও বলে দিচ্ছেন, ‘মেডিকেলের অনেক ডাক্তারই তো বাইরে ব্যবসা সামলান। সেখানে টাকা দিলে একদিনেই পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট, ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরার সুবিধা মেলে।’
তাহলে কি সরকারি হাসপাতালের গরিব মানুষ পরিষেবা পাবেন না? মেডিকেলের সুপার সঞ্জয় মল্লিক বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’ কিন্তু খতিয়ে দেখেও তিনি কি এই অব্যবস্থায় লাগাম টানতে পারবেন? প্রশ্ন থেকেই যায়।
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ আজও উন্নত চিকিৎসার জন্য মেডিকেলের ওপর ভরসা করেন। অথচ আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতেই যদি এক-দেড় মাস পেরিয়ে যায়, এভাবে হয়রান হতে হয়, তাহলে মানুষের সেই ভরসা কি চিরকাল অটুট থাকবে? উঠছে প্রশ্ন।
এই বিভাগে কিন্তু পর্যাপ্ত ফ্যাকাল্টি, এমডি, সিনিয়ার রেসিডেন্টস রয়েছেন। তা সত্ত্বেও কেন ২৪ ঘণ্টার জন্য বিভাগ খোলা রাখা হচ্ছে না? মেডিকেলের অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিৎ সাহার বক্তব্য, ‘রেডিওলজি বিভাগে যথেষ্ট পরিকাঠামো রয়েছে। তারপরেও রোগীকে কেন এক-দেড় মাস পরে তারিখ দেওয়া হচ্ছে সেটা বলতে পারব না।’ রেডিওলজি বিভাগের প্রধান নারায়ণ পণ্ডিতকে সন্ধ্যায় ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
একদিকে যখন কেউ স্পষ্ট করে কিছুই বলছেন না, তখন হাসপাতালের রোজনামচায় ভোগান্তির ছবি ধরা পড়ছে। মামুনের কথাই ধরা যাক। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে মেডিসিনের বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখান তিনি। চিকিৎসক তাঁকে দুটি সাধারণ পেট ব্যথা কমানোর ওষুধ দিয়ে দ্রুত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করিয়ে ফের বহির্বিভাগে দেখানোর পরামর্শ দেন। মামুন বিভাগের সামনে গিয়ে দেখেন সেখানে লম্বা লাইন। বেশ কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষমেশ যখন কাউন্টারের কাছে পৌঁছান, বিভাগের এক কর্মী তাঁকে বলে দেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আসবেন। এই বলে তিনি ৮ মে তারিখ লিখে দেন।
রোগী তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে সমস্যা গুরুতর। চিকিৎসক দ্রুত পরীক্ষা করাতে বলেছেন। জবাব আসে, ‘এখানে এর আগে সম্ভব নয়। তাহলে প্রাইভেটে করিয়ে নিন।’ এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে পরিষেবা না দিয়ে রোগীদের বেসরকারি সেন্টারে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই ‘দোষে’ ‘দুষ্ট’ ওই বিভাগের কিছু ডাক্তারও। বিভাগীয় প্রধান সহ এখানকার বেশিরভাগ চিকিৎসক শিলিগুড়ি, মাটিগাড়া, শিবমন্দিরে একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন আল্ট্রোসনোগ্রাফি করছেন। অথচ মেডিকেলে রোগী এলেই ‘তারিখ পে তারিখ’। এই অব্যবস্থা থেকে আদৌ রেহাই মিলবে? আপাতত উত্তর নেই কারও কাছে।
