নাগরাকাটা: ডুয়ার্সের চা বলয়ে বন্যপ্রাণের আদিম ও নৃশংস লড়াইয়ের এক ভয়ঙ্কর সাক্ষী থাকলেন নাগরাকাটার (Nagrakata) বাসিন্দারা। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, নিজেদের সাম্রাজ্য বা ‘টেরিটরি’ রক্ষা এবং সঙ্গিনী দখলের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইয়েছিল দুই হিংস্র পুরুষ চিতাবাঘ। আর সেই রক্তক্ষয়ী ও ধুন্দুমার সংঘাতের জেরে প্রতিপক্ষের মারণ থাবায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হলো একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ চিতাবাঘকে।
রবিবার বিকেলে নাগরাকাটা চা বাগানের ১১ নম্বর সেকশনে এই ঘটনাটি ঘটেছে। চা বাগানের এই নির্দিষ্ট সেকশনটি নাগরাকাটা বস্তী লাগোয়া হওয়ায় ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে গোটা এলাকায়। খবর পেয়েই বনদপ্তরের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃত চিতাবাঘের দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যান।
বন দপ্তরের চালসা (Chalsa) রেঞ্জের রেঞ্জার অশেষ পাল এই ঘটনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, চিতাবাঘটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ পরিষ্কার হবে। তবে প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয়দের বয়ানের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে যে, যে এটি পারস্পরিক লড়াইয়েরই (conflict) ফল।
বন কর্তা এবং বন্যপ্রাণ ও পরিবেশপ্রেমীদের মতে, বন্য জগতে দুই পুরুষ চিতাবাঘের মধ্যে এমন মরণপণ লড়াই একেবারে নজিরবিহীন বা নতুন কিছু নয়। সাধারণত দুটি প্রধান কারণে এই ধরণের সংঘাত দানা বাঁধে— প্রথমত, কোনো সঙ্গিনী চিতাবাঘকে নিজের দখলে আনা এবং দ্বিতীয়ত, চা বাগান বা সংলগ্ন বনাঞ্চলে নিজের একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। নাগরাকাটার এই ঘটনাতেও এই দুটির মধ্যে কোনো একটি জোরালো ফ্যাক্টর কাজ করেছে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।
এদিকে, এই ঘটনার পর থেকেই নাগরাকাটা বস্তী ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও আতঙ্ক দানা বাঁধছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইদানীং চা বাগান সংলগ্ন এই জনবসতি এলাকায় চিতাবাঘের আনাগোনা ও উপদ্রব আগের চেয়ে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা হঠাৎ করে এদের সংখ্যা বাড়ার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাকার স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সুধামা ওরাওঁ একটি চাঞ্চল্যকর তত্ত্ব খাড়া করেছেন। তিনি জানান, এমনটাও হতে পারে যে, উত্তরবঙ্গের অন্যান্য নানা জনবসতি এলাকা থেকে প্রায়শই যে সমস্ত চিতাবাঘগুলিকে খাঁচাবন্দী করা হয়, সেগুলিকে এনে এই এলাকা সংলগ্ন জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই বাইরে থেকে আসা চিতাবাঘগুলিই খাবারের খোঁজে লোকালয় কিংবা বাগানে ঢুকে পড়ছে। অন্যদিকে বাগানের নিজস্ব টেরিটরিতে আগে থেকেই কিছু চিতাবাঘ তো রয়েছেই। ফলে দুই দলের মধ্যে এই এলাকা দখলের লড়াই শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের পাশাপাশি, চা বলয়ে চিতাবাঘের এই আকস্মিক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বারবার লোকালয়ে চলে আসার প্রবণতা রুখতে বনদপ্তর কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে এলাকাবাসী।
