রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: শুধু বিজেপি সমর্থক নয়, অন্য দলের অনুগামীদেরও প্রভাবিত করার চেষ্টা শুরু করেছে আরএসএস (RSS)। উত্তরবঙ্গে মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) তৃতীয় দিনের কর্মসূচি সেই চেষ্টার প্রমাণ। তিনি শুক্রবার বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বৈঠক করেন শিলিগুড়িতে (Siliguri)। সেই বৈঠকে এমন চিকিৎসক, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন যাঁরা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিংবা বাম ও কংগ্রেসমনস্ক।
ভাগবত রাজনৈতিক ভাবাদর্শ নির্বিশেষে সবাইকে সংঘের কাজে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। মনে করা হচ্ছে, চিরাচরিত ভোটব্যাংক দিয়ে বাংলায় বিজেপিকে জেতানো কঠিন আঁচ করে সমর্থনের পরিধি বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে আরএসএসের মাধ্যমে। সরাসরি রাজনৈতিক কথা না বলে সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে সজ্জন শক্তির পারস্পরিক পরিপূরক হয়ে এক দিশায় কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন ভাগবত।
সমাজের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে, এমন মানুষদের মাধ্যমে চরিত্র গঠনের কথা বলেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালীদের শুক্রবার আরএসএস প্রধানের বৈঠকে ডাকা হয়েছিল শিলিগুড়িতে। যেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছে উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট চিকিৎসক মলয় চক্রবর্তী, শঙ্খ সেন, সজল বিশ্বাস, গোষ্ঠবিহারী দাস প্রমুখকে। কংগ্রেস মনোভাবাপন্ন আইনজীবী অলোক ধারা, শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যাপক বিদ্যাবতী আগরওয়াল, পরিবেশকর্মী সুজিত রাহা, ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়ার মতো ব্যক্তিত্বও উপস্থিত ছিলেন।
যদিও এঁদের অনেকে সংঘের অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলে যান। কয়েকজন অবশ্য প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। চিকিৎসক মলয় চক্রবর্তীর কথায়, ‘আমার জরুরি অস্ত্রোপচারের ডাক এসে গিয়েছিল। তাই অল্প সময় থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।’ উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জন সজল বিশ্বাস ছিলেন পুরো অনুষ্ঠানেই। ছিলেন চিকিৎসক শঙ্খ সেন।
পরিবেশকর্মী সুজিত রাহা বৈঠকে পরিবেশকে পাঠ্যসূচিতে মূল বিষয় হিসেবে রাখার দাবি তোলেন। পরে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ ঐচ্ছিক বিষয় থাকায় কেউ সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এতে পরিবেশের আরও ক্ষতি হচ্ছে।’ অধ্যাপক বিদ্যাবতী আগরওয়ালের বক্তব্য, ‘আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাই গিয়েছিলাম। অনেকে অনেক কথা বলেছেন, সেগুলি শুনেছি। সংঘ প্রধানের বক্তব্যও শুনেছি।’
মনে করা হচ্ছে, তৃণমূল বা কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ এবং বাম মনোভাবাপন্ন বিশিষ্টজনকে ডেকে সংঘের বীজ বপন করে গেলেন আরএসএস প্রধান। এই বুদ্ধিজীবী সম্মেলন সেই অর্থে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে নতুন সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিত। বুদ্ধিজীবীদের সংঘের পাঠ পড়িয়েছেন ভাগবত। সংঘ কী, সংঘের কাজ কী ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে তিনি বুঝিয়েছেন, সংঘ কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। সংঘ সমাজের কাজ করে।
তিনি কুলরীতি, সুসংগত প্রথা এবং দেশের কল্যাণে সহায়ক আচরণগুলির নিয়মিত চর্চার ওপর জোর দেন। তাঁর ভাষায়, সমাজের উপর নিজের পরিবারের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নির্ভরশীল- এই উপলব্ধি থেকে সময় ও সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখার দরকার আছে সবার। বিশিষ্টদের তিনি সংঘের কাজকর্ম দেখার, সংঘের দপ্তরে যাওয়ার, ইচ্ছা হলে সংঘের সঙ্গে কাজ করার ডাক দেন।
সরসংঘচালক বলেন, ‘সংঘকে কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা প্রচলিত সংগঠন কাঠামোর মধ্যে বেঁধে বোঝা যায় না।’ তাঁর কথায়, ‘সংঘ কারও বিরোধিতা করার জন্য বা নিজের জন্য কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়নি। বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং প্রসিদ্ধি থেকে দূরে থেকে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে সমাজসেবায় যুক্ত মানুষদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন সংঘের লক্ষ্য।’
বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের পর মাটিগাড়ার একটি উপনগরীতে সংঘের উত্তরবঙ্গ প্রান্তের বিভিন্ন কর্মকর্তার পরিবারের সঙ্গে এক ঘণ্টার চা বৈঠকে যোগ দেন সংঘ প্রধান। সেখানে ছিলেন দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির দুই সাংসদ রাজু বিস্ট ও জয়ন্ত রায়। বিজেপির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারীও সেখানে দেখা করেন ভাগবতের সঙ্গে। সেখানে নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা হয়।
যদিও পরে রাজু বলেন, ‘আরএসএস প্রধান এসেছেন সংঘের কাজে। সেখানে সাংসদ এবং আরএসএস কর্মী হিসেবে আমি গিয়েছি। নির্বাচন সংক্রান্ত কী আলোচনা হয়েছে বা আমাদের তিনি কী বলেছেন সেটা সংবাদমাধ্যমে বলার জন্য নয়।’ বুদ্ধিজীবীদের বৈঠকে চিকেন নেকের সুরক্ষা, উত্তরবঙ্গে মাদকের কারবার বৃদ্ধি, পরিবেশ সচেতনতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিশিষ্টজনরা এসব নিয়ে প্রশ্ন করলেও চিকেন নেকের সুরক্ষার বিষয়টি সরকারের বলে মন্তব্য করেছেন সংঘ প্রধান। তবে মাদকের কারবার রুখতে সমাজকে জাগ্রত হওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
