রাহুল মজুমদার ও পূর্ণেন্দু সরকার, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি: আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে হিন্দুত্বকে জাগিয়ে তোলাই পথ বলে বার্তা দিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)। তিনদিনের সফরে তিনি এখন শিলিগুড়িতে (Siliguri)। বৃহস্পতিবার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল। ওই বৈঠকে তাঁর ভাষণ ছাড়া ছিল প্রশ্নোত্তর পর্বও। সেই পর্বে উঠে আসে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বলে বিজেপির সবসময়ের অভিযোগ।
এই সমস্যায় সংঘের ভূমিকা জানতে চান একজন তরুণ। উত্তরে ভাগবত বুঝিয়ে দেন, ‘যেহেতু সংঘ রাজনৈতিক দল নয়, তাই সরাসরি রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে সরকারকে নিজের মতামত জানাতেই পারে সংঘ।’ সেই প্রসঙ্গে আসে হিন্দুত্বের প্রশ্ন। সমাজে হিন্দুদের জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, ‘তাতেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি কমে যাবে।’
এই সভায় রাষ্ট্রোত্থানের পক্ষে সওয়াল করেন আরএসএস প্রধান। সেই আহ্বানে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের চিরাচরিত ভাবনার কিছু বদল ঘটানো হয়েছে। ভাগবতের কথায়, ‘আমরা বলি, বৈচিত্র্যই ঐক্যের আবিষ্কার।’ দু’দিন ধরে তিনি উত্তরবঙ্গে আছেন। বৃহস্পতিবার যুবসমাজের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাঁর সরাসরি আহ্বান ছিল, ‘আসুন, আমরা সকলে রাষ্ট্রোত্থানের এই মহান অভিযানে অংশীদার হই।’
রাষ্ট্রোত্থান যে পুরোপুরি হিন্দু ভাবনায়, হিন্দু সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে- সেই বার্তা ছিল ভাগবতের ভাষণে। তবে হিন্দুত্বের পরিসরকে তিনি সম্প্রসারিত করেছেন যুব প্রজন্মের সামনে। তাঁর কথায়, ‘পূজাপদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এদেশে আমরা সবাই এক রাষ্ট্র ও এক সংস্কৃতির অংশ।’ আমরা সবাই বলতে তিনি যে হিন্দুর পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাও স্পষ্ট।
আরএসএস প্রধান বলেন, ‘সকল বৈচিত্র্যকে সম্মান করার স্বতন্ত্র পরম্পরাই আমাদের হিন্দু সংস্কৃতি।’ তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘আজ যাঁরা নিজেদের হিন্দু বলে মানতে চান না, তাঁরাও কিন্তু হিন্দু পূর্বপুরুষদের বংশধর।’ উত্তরবঙ্গকে অনেক আগে থেকে পাখির চোখ করেছে আরএসএস। বিভিন্ন জেলায় একেবারে গ্রাম স্তরে সংঘের শাখা অনেক বেড়েছে। ভাগবতের এবারের সফরে স্পষ্ট, সংঘের ফোকাস এখন তরুণ প্রজন্মের ওপর। শুধু যুবদের সঙ্গে সংঘ প্রধানের বৈঠক তার প্রমাণ।
তিনি নিজেও বলেন, ‘ভবিষ্যতের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিক বা না নিক, অবশ্যম্ভাবীভাবে যুবসমাজের কাঁধেই পড়বে।’ প্রকৃত অর্থে যুবসমাজের এখনকার প্রবণতা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও কেরিয়ার সর্বস্বতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ভাগবত। বৃহস্পতিবারের সভায় তিনি যুবদের সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি কেবল নিজেদের জন্য কাজ করি, তবে কি আমি ও আমার পরিবার সত্যিই নিরাপদ থাকবে?’
মনে করা হচ্ছে, শুধু নিজের বা পরিবারের কথা ভাবলে একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্বের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাঁর এই বক্তব্যের নেপথ্যে। শিলিগুড়ির সভায় সংঘের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বঙ্গীয় হিন্দু মহামঞ্চের কর্তাদের পাশাপাশি বিজেপির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। বিজেপির শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলা কমিটির সভাপতি রাজু সাহা, সাধারণ সম্পাদক নান্টু পালকে দেখা গিয়েছে। ছিলেন মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মনও।
সংঘের দাবি, প্রায় সাড়ে সাত হাজার তরুণ এই সভায় এসেছিলেন। আরএসএস প্রধানের জন্যে সেবক রোডের সারদা শিশুতীর্থ স্কুল এলাকা নিরাপত্তায় মুড়ে দিয়েছিল পুলিশ। দুই দফায় মোট ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ভাষণ দেন সংঘ প্রধান। প্রথম ধাপে তিনি ভাষণ দেন, দ্বিতীয় ধাপে যুবদের প্রশ্নের উত্তর দেন। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা সহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, তাঁদের অনেকেই বিজেপির সক্রিয় কর্মী।
নির্বাচনের আগে সংঘ প্রধানের সভা এবং যুবশক্তির প্রদর্শন আদতে রাজ্যের শাসকদলকে চাপে রাখতে বিজেপির কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। সভায় উপস্থিত ধূপগুড়ির বাসিন্দা সুভাষ বর্মনের বক্তব্য, ‘আমরা সংঘের সঙ্গে আছি, বিজেপির সঙ্গেও আছি।’ মালদার অনিন্দিতা সরকার বলেন, ‘মোহনজি হিন্দু সংস্কৃতি রক্ষার সৈনিক। ওঁর দেখানো পথে চলতে পারা আমাদের সৌভাগ্য।’
যুবসমাজের সামনে ভাষণে ভারত ও হিন্দুত্বকে একই পংক্তিতে বসান ভাগবত। সরসংঘচালকের ভাষায়, ‘যাঁর হৃদয়ে ভারতভক্তি নেই, তিনি হিন্দুই নন। ভারতের প্রতিটি ব্যক্তি ভারতের জন্য বাঁচবে, ভারতের জন্য মরবে, ভারতকে জানবে ও ভারতকে মানবে।’ এই প্রসঙ্গে তিনি টেনে আনেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগাওয়ারের প্রসঙ্গ। যিনি সংঘে ডক্টরজি সম্বোধনে পরিচিত।
সরসংঘচালক বলেন, ‘দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির লক্ষ্যে ব্যক্তি নির্মাণের কাজের সূচনা করেন ডক্টরজি। সংঘের স্বয়ংসেবকরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে কাজ করে এগিয়ে চলেছেন।’ যুবদের উদ্দেশে তাঁর সরাসরি আহ্বান, ‘সংঘে আসুন, সংঘকে পরখ করুন এবং সবকিছু সঠিক মনে হলে সংঘের কাজে যুক্ত হন। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা সাভারকার ও ডক্টরজিকে তিনি কার্যত ভারতের অন্য মনীষীদের সঙ্গে একাসনে বসিয়েছেন।
ভাগবতের ভাষায়, ‘বীর সাভারকার, সুভাষচন্দ্র বসু ও লোকমান্য তিলকের মতো মহাপুরুষদের মতো ডক্টরজি উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজকে সংশোধন না করলে দেশের মুক্তি ও উন্নতির সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।’ বন্দে মাতরম বিতর্কের মাঝে তাঁর ‘কিশোর বয়সেই ডক্টরজি নাগপুরের বিদ্যালয়ে বন্দে মাতরম আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন’ মন্তব্যে স্বাধীনতা আন্দোলনে সংঘের পূর্বসূরিদের অবদানের দাবি সূক্ষ্মভাবে আছে।
স্বাধীনতা আন্দোলনে বরং কংগ্রেসকে খাটো করার চেষ্টা স্পষ্ট তাঁর ভাষণে। ভাগবতের কথায়, ‘সমাজকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জাগ্রত করার উদ্দেশে ইংরেজদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেসকে ভারতীয় নেতারা নিজেদের করে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে স্বার্থের কারণে সেই রাজনৈতিক ধারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।’
