শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: ১ মিনিটও নয়, হিসেব বলছে একজন রোগীপিছু চিকিৎসক সময় দিচ্ছেন মাত্র ৪৮ সেকেন্ড! সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে যখন নানা রকমের প্রচার চালানো হচ্ছে তখন এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (MJNMCH) বহির্বিভাগে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালের জেনারেল ওপিডি-তে গড়ে ৩০০ জন করে রোগী আসছেন। সকাল নয়টা থেকে দুটো পর্যন্ত বহির্বিভাগ খোলা থাকে। কিন্তু বাস্তবে দশটার আগে চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া যায় না বলেই অভিযোগ।
এই হিসেবে একজন চিকিৎসক যদি এক মিনিটও বিরতি না নিয়ে টানা চার ঘণ্টা রোগী দেখেন তবুও রোগীপিছু তিনি সময় দিচ্ছেন ৪৮ সেকেন্ড। রোগীর থেকে তাঁর সমস্যার কথা শোনা, তাঁকে পরীক্ষা করা, প্রেসক্রিপশন লেখা– সবই চলছে ওই সময়ের মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এইটুকু সময়ের মধ্যে একজন রোগীর চিকিৎসা কি আদৌ সম্ভব?
বুধবার হাসপাতালের বহির্বিভাগ ঘুরে দেখা গেল রোগীদের লম্বা লাইন। সেই লাইন বিল্ডিং পেরিয়ে বাইরে চলে গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় জেনারেল ওপিডি এবং শিশু বিভাগে। তখন বেলা একটার আশপাশে। জেনারেল ওপিডির দরজার বাইরে থিকথিক করছে রোগীর ভিড়। রোগীদের নাম নথিভুক্ত হওয়ার পর দ্রুত একজন করে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফিরে আসছেন। চিকিৎসকের ঘর থেকে বেজার মুখে বেরিয়ে এলেন হাঁড়িভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা সুলেমান আলি। কয়েকদিন ধরে কাশি, সঙ্গে হালকা জ্বর। না কমায় হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসক নাকি পুরো কথা শোনার আগেই প্রেসক্রিপশনে গাদাখানেক ওষুধ লিখে দিয়েছেন! সুলেমান বলছিলেন, ‘চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর কাশি হয়েছে শুনেই তিনি ওষুধ লেখা শুরু করে দিলেন। বাকি কথা বলার আগেই হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিলেন। ততক্ষণে পরের রোগী হাজির। স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করা তো দূরের কথা, ডাক্তারবাবু আমাকে কোনও প্রশ্ন করেননি। এখন মনে হচ্ছে বাইরে ডাক্তার দেখালেই ভালো করতাম।’ একই অভিযোগ বাকি রোগীদেরও।
রোগীদের অভিযোগ চিকিৎসকরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কিন্তু সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক ও পরিকাঠামোর মধ্যে প্রতিটি রোগীকে আলাদাভাবে খুঁটিয়ে দেখা যে কার্যত অসম্ভব তা স্বীকারও করছেন চিকিৎসকরা। যদিও এমএসভিপি সৌরদীপ রায় বলেছেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। তবে প্রত্যেক চিকিত্সক প্রত্যেক রোগীকেই গুরুত্ব দিয়েই দেখেন। কোনও রোগীর সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
চিকিৎসকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জেলা সম্পাদক ডাঃ অরিন্দম বুটের বক্তব্য, ‘চিকিৎসক কম থাকলে কম সময়ের মধ্যেই বেশি রোগী দেখতে হয়। এটি একটি সমস্যা। তবে চিকিৎসক নিয়োগ হলেই এই সমস্যা মিটবে।’ এমজেএন মেডিকেলের চিকিৎসক বিশ্বপ্রিয় সিনহার কথায়, ‘রোগী বেশি থাকলে দ্রুত তাঁদের দেখতে হয়, এটা ঠিক। তবে চিকিৎসকরা সেই কাজেও অভ্যস্ত। তাই দ্রুত রোগী দেখা হচ্ছে মানে এই নয় যে চিকিৎসায় খামতি থাকছে। প্রত্যেকটি রোগীকেই যথাযথভাবে দেখা হয়।’
শুধু এমজেএন মেডিকেলই নয়, সরকারি অন্যান্য হাসপাতালেও একই ছবি। শুধু রোগীর পরিজনরাই নন, চিকিৎসকদের একাংশও বলছেন, হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালে এবং চিকিৎসকরা আরও বেশি সময় নিয়ে রোগীদের দেখলে পরিষেবার মান আরও বাড়বে। তবে কবে চিকিৎসক নিয়োগ হবে এখন সেদিকেই হাপিত্যেশ করে তাকিয়ে রোগীরা।
