পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: চিনের ওপর নজরদারি বাড়াতে কালিম্পং জেলার নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে (Neora Valley Nationwide Park) ভারত-ভুটান-সিকিমের আন্তর্জাতিক সংযোগস্থল থেকে কিছুদূরে জোরপোখরির ওপরে ৩ হেক্টর জমি চাইল সেনাবাহিনী। সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলের কোর এলাকায় সেনাছাউনি গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রকের মাধ্যমে রাজ্যকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক (Military Camp Proposal)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ ফুট উচ্চতায় অত্যন্ত দুর্গম ওই ‘ভার্জিন ফরেস্টে’ ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা করে দ্রুত রিপোর্ট জমা দিতে গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগ-১ কে নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য বন দপ্তর।
বন্যপ্রাণীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডরে সেনাছাউনি হলে উত্তরবঙ্গের নেওড়াভ্যালি, সিকিমের প্যাঙ্গোলাখা এবং ভুটানের তোর্ষা জাতীয় উদ্যানের বাস্তুতন্ত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে, এমনটাই অভিমত পরিবেশপ্রেমী থেকে রাজ্য বন দপ্তরের কর্তাদের। তঁারা বলছেন, সেখানে যাতায়াতের জন্য জঙ্গলের কোর এলাকা চিরে সংযোগকারী রাস্তা তৈরি হবে, যা তোদে-তাংতা হয়ে ভারত-ভুটান সীমান্তের নির্মীয়মাণ রাস্তার সঙ্গে জুড়বে। এর ফলে পূর্ব হিমালয়ে এই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন হওয়া প্রায় অনিবার্য। কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক সমীকরণে এই পরিকল্পনা ছাড়পত্র পেলে তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণরা চরম সংকটে পড়বে। পাশাপাশি পাহাড়ে ধসের আশঙ্কাও অনেক বাড়বে।
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই অরণ্য কালিম্পং জেলায় হলেও সুরক্ষার স্বার্থে এর পরিচালনা করে গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগ। ১৯৮৬ সালে জাতীয় উদ্যান হওয়া নেওড়াভ্যািলতে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। দেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পার্কের সর্বোচ্চ পাহাড়ি এলাকা হল রাচেলা পিক, যার উচ্চতা প্রায় ১০ হাজার ৬০০ ফুট। রাচেলার ঠিক নীচে ১০ হাজার ২৫৯ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত জোরপোখরি লেক। জোরপোখরি হয়ে রাচেলা পাসই হল ভারত, ভুটান এবং সিকিমের সংযোগস্থল, যা বন্যপ্রাণী চলাচলের অন্যতম আন্তর্জাতিক করিডর। শীতের মরশুমে বন্যপ্রাণীরা নেওড়াভ্যালি, তোর্ষা ও প্যাঙ্গোলাখা বনাঞ্চলের মধ্যবর্তী এই ‘সেফ করিডর’ দিয়েই চলাচল করে, যার প্রমাণ ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে এই এলাকার গুরুত্ব অপরিসীম। রাচেলা ভিউপয়েন্ট থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ, নাথুলা রেঞ্জ, ভুটান পাহাড়, দার্জিলিং ও গ্যাংটক শহর দেখা যায়। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে বিবেচনা করলে রাচেলা পাস থেকে ভুটান এবং সিকিমের বিমানঘাঁটি অত্যন্ত কাছে। সূত্রের খবর, ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় তোর্ষা সংরক্ষিত বনাঞ্চল সংলগ্ন সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ। ভারতের দিকে নেওড়াভ্যালির মধ্যে লাভা বাজার এলাকা পর্যন্ত সাধারণ যানবাহন চলাচল করে। বনের ভেতরে চৌদ্দ ফেরি পর্যন্ত বন দপ্তর নিজেদের টহলদারির জন্য বিপজ্জনক রাস্তায় ফোর-হুইল গাড়ি চালায়। রাচেলা পাস, জোরপোখরি থেকে রুকা, তাংতা এবং আলুবাড়ি, মূলখাড়কা, পিএইচই ক্যাম্প ও চৌদ্দ ফেরি হয়ে লাভা চেক পয়েন্ট পর্যন্ত শুধুমাত্র দুর্গম ট্রেকিং রুট রয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতীয় সেনা জোরপোখরির ১০ হাজার ২৫৯ ফুট উচ্চতায় ছাউনি করতে বন দপ্তরের কাছে জমি চেয়েছে। তবে রাজ্যের বনকর্তাদের আশঙ্কা, সেনাছাউনি হলে যানবাহন চলাচলের রাস্তা, পাকা পরিকাঠামো ও নির্মাণকাজ করতে হবে। সেনা জওয়ানদের যাতায়াত বাড়বে, মজুত করা হবে সমরাস্ত্র ও নজরদারির অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। ইতিমধ্যেই ভারতের দিকে খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা, বিন্দু, গোদক, চিসাং, তোদে ও তাংতা হয়ে সিকিমের সংযোগকারী রাস্তাটিও নেওড়াভ্যালির সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা দিয়ে তৈরি হচ্ছে। ফলে একদিকে নেওড়াভ্যালি লাগোয়া ভুটানের সড়ক, সিকিমের বিমানঘাঁটি এবং অন্যদিকে তোদে-তাংতার নির্মীয়মাণ রাস্তা— সবদিক দিয়েই যোগাযোগে সুবিধা হবে।
কিন্তু পরিবেশবিদদের মূল উদ্বেগ, নেওড়াভ্যালি দেশের অন্যতম ‘ভার্জিন ফরেস্ট’, যা ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। এখানে রয়েছে বিরল ওক ও রডোডেনড্রনের প্রাচীন চিরহরিৎ অরণ্য। এমন অরণ্যের মধ্যে সেনাছাউনি হলে প্রচুর গাছ কাটা পড়বে এবং বন্যপ্রাণীদের আন্তর্জাতিক করিডরে বাধা তৈরি হবে। ফলে ইউনেসকোর স্বীকৃতি নিয়েও সংশয় দানা বঁাধছে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অনিমেষ বসু জানান, ‘এই অরণ্য বিপন্ন রেড পান্ডা, হিমালয়ান ব্ল্যাক বেয়ার, ক্লাউডেড লেপার্ড, মার্বেলড ক্যাট ও ইন্ডিয়ান ওয়াইল্ড ডগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর প্রধান আশ্রয়স্থল। সেনাছাউনি হলে এদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে পারে।’
রাজ্য বন দপ্তরের এক বনাধিকারিক বলেছেন, নীতিগত বিষয়ে রাজ্য সরকার ও বনমন্ত্রীই পদক্ষেপ স্পষ্ট করতে পারবেন। রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁকে একাধিকবার ফোন এবং মেসেজ করা হলেও তিনি উত্তর দেননি।

