সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: ভিনরাজ্যের কাজ ছেড়ে নিজের পরিবারের কাছে ফেরার জন্যে যেসব পরিযায়ী শ্রমিক (Migrant Staff) রাজ্য সরকারের ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পে প্রাথমিক সহায়তা নিয়েছেন তাঁরা এখন মহাফাঁপরে পড়েছেন। দ্বিতীয় কিস্তি থেকে আর কোনও টাকাই তাঁদের অ্যাকাউন্টে যেমন ঢোকেনি, তেমনই বাইরে কাজে না যাওয়ার শর্ত ঘাড়ে চেপেছে তাঁদের। ইতিমধ্যেই এঁদের একটা বড় অংশ শর্ত ভেঙেই ফের ভিনরাজ্যে নিজের কাজে ফিরে গিয়েছেন পেট চালানোর তাগিদে। অনেকে এখনও বাড়ি না ছাড়লেও দিনের পর দিন কম মজুরির কাজ করায় বা কাজ না পেয়ে ভিনরাজ্যের দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছেন।
চলতি বছরের ১৮ অগাস্ট রাজ্যের তরফে পরিযায়ীদের ঘরে ফেরাতে ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প ঘোষণার পর অনলাইনে আবেদন জমা শুরু হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর জলপাইগুড়ির সরকারি মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে প্রথম ‘শ্রমশ্রী’র পাঁচ হাজার টাকার চেক তুলে দেন ধূপগুড়ি শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভিনরাজ্যে ডাম্পারচালক প্রবীর মণ্ডলের স্ত্রী শ্যামলীর হাতে। বাড়িতে স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে দক্ষিণের রাজ্যে ডাম্পার চালাতে যাওয়া প্রবীরের মাসিক বেতন ছিল ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া থাকা-খাওয়া, ওভারটাইম মিলত। বাড়ি ফেরার জন্য প্রথম দফায় পাওয়া ৫০০০ টাকা ছাড়া তিন মাসে আর মেলেনি সরকারি সহায়তা। উপরন্তু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাইরে না যাওয়ার সরকারি ফরমান। আপাতত স্ত্রীর টিউশন পড়ানোর টাকায় এবং কেটারিং সার্ভিসে খাবার পরিবেশন বা জমিতে খেতমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে প্রবীরকে। প্রবীর জানান, চলতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশে কাজ করার সময় সহকর্মী ময়নাগুড়ির রাজারহাটের বাসিন্দা অমল বিশ্বাসের মুখে শুনে জনাচারেক মিলে মোবাইল থেকে অনলাইনে ‘শ্রমশ্রী’ পোর্টালে আবেদন করেন তাঁরা। ৬ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের তরফে তাঁকে ফোনে জানানো হয় ১০ সেপ্টেম্বর জলপাইগুড়িতে হাজির থেকে ৫০০০ টাকার সহায়তা নিতে হবে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে। নিজে না ফিরতে পারায় স্ত্রীকে জলপাইগুড়ি পাঠান প্রবীর।
তাঁর বক্তব্য, প্রথম দফার পর আর কিছুই পাইনি। তাছাড়া ৫০০০ টাকায় কী করে সংসার চালাব। তাই বহু পরিচিত সহকর্মী সহায়তা নিয়েও অন্য রাজ্যে কাজে ফিরে গিয়েছেন। আমিও এবার ঝাড়খণ্ড বা অসমে কাজে চলে যাব। দুই জায়গা থেকেই ভালো বেতনের অফার আছে।’
রাজ্যে প্রথম ‘শ্রমশ্রী’ সহায়তাপ্রাপক যখন ভিনরাজ্যে পা বাড়িয়ে রয়েছেন তখন আশপাশের এলাকা, এমনকি প্রতিবেশী দুই জেলা আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের এমন অনেকের খবর মিলেছে যাঁরা প্রথম দফার সহায়তা পাওয়ার পর ইতিমধ্যেই পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে কর্মস্থলে। এই মুহূর্তে কর্ণাটকে শাটারিং মিস্ত্রির কাজে যুক্ত ‘শ্রমশ্রী’ প্রাপ্ত ধূপগুড়ি শহরের বাসিন্দা এক তরুণের কথায়, বাড়ি ফেরার জন্য ১ বছরে ৬০ হাজার টাকা পেলেও তা দিয়ে সংসার চলবে না। ভিনরাজ্যে কাজ করলে দৈনিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন হয়। আমাদের রাজ্যে কাজের সুযোগ যেমন কম তেমনই মজুরিও অনেক কম। তাই চলে আসতে বাধ্য হয়েছি।
একইরকম অভিজ্ঞতা শোনালেন আলিপুরদুয়ার জেলার শালকুমার, কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা এলাকার বেশ কয়েকজন। কোচবিহারের মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের এক বাসিন্দা, পেশায় ঢালাইমিস্ত্রি এক তরুণের কথায়, ঘর পরিবার ছেড়ে বহুদূরে নিশ্চিন্তে থাকতে হলে এলাকার শাসকদলের নেতাদের কথা মেনে চলাটাই মঙ্গল। এমনই এক-দুজনের কথাতেই অনলাইনে ‘শ্রমশ্রী’ আবেদন করি এবং সহায়তা নিয়ে বাড়ি ফিরি। কিছুদিন পর ওঁদের বোঝাতে পেরেছি বাড়িতে থেকে আগের মতো উপার্জন করতে পারব না। সরকারি প্রকল্প যা-ই বলুক আমরা স্থানীয় নেতাদের জানিয়েই ফের বাইরে এসেছি কাজের জন্যে।
মাত্র মাসতিনেকেই যাঁরা শ্রমশ্রী-র বাঁধন ছিঁড়ে ভিনরাজ্যে কাজের দিকে ঝুঁকেছেন তাঁরা সবাই একমত- আর্থিক সহায়তার বদলে কাজের সুযোগ তৈরি করুক রাজ্য সরকার। সে কাজে সরকারি উদ্যোগ কতটা তা নিয়ে সন্দেহ স্পষ্ট পরিযায়ীদের চোখেমুখে, কথায়।
