মাথাভাঙ্গা: বিজয়া, দীপাবলি থেকে শুরু করে মদনমোহন বাড়িতে পুজো— যে কোনও শুভকাজে মাথাভাঙ্গাবাসীর প্রথম পছন্দ ‘কাঞ্ছাদার কালাকাঁদ’। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ইমিগ্রেশন রোডে মদনমোহন ঠাকুরবাড়ির কাছে একটি ছোট্ট মিষ্টির দোকান তৈরি করেন কাঞ্চন ভৌমিক ওরফে কাঞ্ছাদা। স্বাদে-গন্ধে একেবারে স্বতন্ত্র হওয়ায় তাঁর হাতে তৈরি কালাকাঁদ অল্প সময়ের মধ্যেই মাথাভাঙ্গায় নিজস্ব পরিচিতি লাভ করে। দোকানের বহিরঙ্গে তেমন কোনও আড়ম্বর নেই, কিন্তু তাতে কী! একডাকে মাথাভাঙ্গার প্রত্যেকে কাঞ্ছাদার দোকান চেনেন।
২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাঞ্চন ভৌমিক। এরপর প্রায় এক মাস দোকানের শাটার নামানো ছিল। স্বামীর স্মৃতি, তিন কন্যার ভবিষ্যৎ আর ক্রেতাদের নিরন্তর প্রশ্ন— সবমিলিয়ে দীপালি ভৌমিক আর থেমে থাকতে পারেননি। মেজো মেয়ে মৌমিতা ভৌমিককে নিয়ে আবার দোকান শুরু করেন। অন্য মিষ্টি তৈরির জন্য কারিগর থাকলেও দীপালি নিজেই কালাকাঁদ বানান। একেবারে ভোর থেকে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। বেলা বারোটা বাজলেই ঢিমে আঁচে কড়াইয়ে দুধ চাপিয়ে দেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধৈর্য ধরে জ্বাল দেওয়ার পর দুধের রং, গন্ধ আর ঘনত্ব বদলে তৈরি হয় পরিচিত স্বাদ।
স্বামীর কাছ থেকেই কালাকাঁদ বানানো শিখেছেন দীপালি। কীসের গুণে কাঞ্ছাদার কালাকাঁদের এত স্বাদ? রেসিপি ‘ফাঁস’ করতে চাননি দীপালি। জানিয়েছেন, ২৫ বছর আগে ওই কালাকাঁদের দাম ছিল মাত্র ২ টাকা। ১৫ বছর আগে দাম বেড়ে হয় ৭ টাকা। আর এখন এক পিস কালাকাঁদের দাম ১০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে চারশো কালাকাঁদ তৈরি হয়। একটিও অবিক্রিত থাকে না। কাঞ্চনের বাবা কানাইলাল ভৌমিকও ময়রা ছিলেন। তাঁর তৈরি ছানার সন্দেশ ছিল জেলার গর্ব। তবে ইমিগ্রেশন রোডের দোকান কাঞ্চনের তৈরি। তাঁর মৃত্যুর ছয় বছর পরও ওই দোকানের কালাকাঁদ সমান জনপ্রিয়।
পশ্চিমপাড়ার ব্যবসায়ী মহাবীর বথরা জানালেন, তাঁর বাড়িতে যে কোনও অনুষ্ঠানে কাঞ্ছাদার কালাকাঁদ থাকবেই। তিনি বলেন, ‘দীপাবলি, বিজয়া হোক কিংবা কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে মিষ্টি পাঠানো— আমার প্রথম পছন্দ ওই দোকানের কালাকাঁদ। একদম খাঁটি মিষ্টি। স্বাদে অতুলনীয়।’ শীতলকুচি রোডের রাজর্ষি ভট্টাচার্য কিংবা দীনবন্ধুপল্লির বাপি সাহার মতো অনেকেরই আবার সপ্তাহে অন্তত একদিন কাঞ্ছাদার কালাকাঁদ না খেলে মন ভরে না। মাথাভাঙ্গার পূজা চক্রবর্তীর কথায়, ‘মদনমোহন বাড়িতে পুজো দিতে গেলে থালায় কালাকাঁদ না থাকলে পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাড়ির সবাই এই দোকানের মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন।’
মৌমিতার স্বপ্ন বাবার তৈরি এই দোকানকে আরও বড় করে তৈরি করবেন। দীপালির কাছে অবশ্য কালাকাঁদ শুধু মিষ্টি নয়, প্রতিদিনের লড়াই আর ভালোবাসার এক জীবন্ত স্মৃতি।
