কল্লোল মজুমদার, মালদা: এমনিতে দেখে মনে হবে ঘরে ফেরার পর খোশমেজাজে পিকনিকে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তৃণমূলে ভাঙন ধরাতে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন মৌসম ও ইশা খান চৌধুরী। তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে সদ্য শনিবারেই মালদায় ফিরেছেন (Malda)। রবিবার মৌসমকে দেখা গেল পরিবারের সঙ্গে পিকনিকে মেতে উঠতে। সেখানেই ইশা রাজ্যের শাসকদলে বড়সড়ো ভাঙনের ইঙ্গিত দিলেন। মুচকি হেসে ইঙ্গিত দিলেন মৌসমও। কোথায় ভাঙন ধরবে? স্পষ্ট করে মৌসম কিছু না বললেও সূত্রের খবর, পুরাতন মালদা পুরসভার তৃণমূলের একাধিক জনপ্রতিনিধি যোগ দিতে পারেন কংগ্রেসে। কংগ্রেসের অন্দরমহল বলছে, তাতে এমনকি বদলে যেতে পারে সেই পুর বোর্ডের সমীকরণটাও।
রবিবার এব্যাপারে জানতে চাইলে কংগ্রেসের মালদা জেলা কমিটির সভাপতি ইশা খান চৌধুরীর জবাব, ‘একটু ধৈর্য ধরুন। আর কয়েকদিনের মধ্যেই খবর পাবেন।’ একই সঙ্গে মৌসম নুরের মন্তব্য, ‘আমাকে দেখে যাঁরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই ফিরে আসবেন। ইতিমধ্যে যোগাযোগও শুরু করেছেন। তবে এখনই নাম বলছি না কৌশলগত কারণে।’
প্রতিবেশী দুই পুরসভা, ইংরেজবাজার ও পুরাতন মালদা-দুই জায়গাতেই এখন তৃণমূলের বোর্ড। পুরাতন মালদা পুরসভার মোট কাউন্সিলার ২০ জন। এই মুহূর্তে তার মধ্যে তৃণমূলের ১৮ জন ও বিজেপির ২ জন। সম্প্রতি তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশে চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কার্তিক ঘোষ। নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন বিভূতিভূষণ ঘোষ। আর এরপর থেকেই বহু কাউন্সিলার ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আর মৌসম ফিরতেই মহানন্দার ওপারের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে তৈরি হওয়া সেই ক্ষোভের সদ্ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়েছেন জেলা কংগ্রেস নেতারা। যদিও তৃণমূলের জেলা সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সীর কটাক্ষ, ‘কংগ্রেস নেতাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে সবে তাদের জন্ম হল। আগে মালদার মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাক। এমনিতেই তো সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছে। চ্যালেঞ্জ থাকল, পুরাতন মালদা পুরসভা ভেঙে দেখাক।’ এব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে চেয়ারম্যানকে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে পুরাতন মালদা পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলামের মন্তব্য, ‘স্বপ্ন দেখতে তো আর কাউকে বাধা দিতে পারি না।’
রবিবার ছিল পৌষ মাসের শেষ রবিবার। তাই মালদা জেলাজুড়ে সর্বত্র বনভোজনের ধুম ছিল। পুরাতন মালদার কাদিরপুরে এক পারিবারিক বন্ধুর খামারবাড়িতে বনভোজনে গিয়েছিলেন সপরিবার মৌসম নুর। ছিলেন ইশা খান চৌধুরী, মৌসমের দিদি লিজু। তাছাড়াও ছিলেন কংগ্রেসের প্রাক্তন দুই বিধায়ক অর্জুন হালদার আর মোত্তাকিন আলম। দেখা যায়, খামারবাড়ির মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছেন দুই বোন মৌসম আর লিজু। পরিচিতদের আবদার মেনে সেলফিও তোলেন দেদার। বনভোজনের মাঝেই সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন ইশা আর মৌসম। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মৌসম উত্তর দেন, ‘উত্তর মালদা ও দক্ষিণ মালদা দুই এলাকা থেকে যাঁরা আমাকে দেখে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই ফিরে আসতে চাইছেন কংগ্রেসে। যোগাযোগ শুরু করেছেন। আমাদের দলে ওঁদের জন্য সবসময় দরজা খোলা। আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন, দেখুন কী হয়।’ আর বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে মৌসমের মন্তব্য, ‘আমরা এই মুহূর্তে জোট করতে চাইছি না। আমরা চাই মালদার ১২ আসনে কংগ্রেস এককভাবে লড়বে। আমরা প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছি। বাকিটা নির্ভর করবে ওদের ওপর।’
বিধানসভা ভোটের আগে পুরোদস্তুর ময়দানে নেমে পড়ার বার্তা এদিন দিয়েছেন মৌসম। তিনি বলেন, ‘জেলার ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রত্যেকটি এলাকায় গিয়ে আমি প্রচার করব। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব চাইলে সারারাজ্যের প্রতিটি জেলায় গিয়ে প্রচার করতে রাজি আছি।’
এদিন বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে ইশা খান চৌধুরীর মন্তব্য, ‘এ ব্যাপারে আমি কী বলব? যা বলার তো বলেই দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। মালদা এসে তিনি জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আগামী নির্বাচনে কারা কারা সিপিএমের সঙ্গে জোট চান না, তাঁদের হাত তুলতে বলেন। জেলার সব নেতাই হাত তুলেছিলেন। এরপর আর কিছু বলার মানে হয় না। আমি নিজেও চাই একা লড়াই করতে।’
মৌসম কি ভোটে দাঁড়াচ্ছেন? দাঁড়ালে কোথা থেকে? প্রশ্নের উত্তরে জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ইশার মন্তব্য, ‘জেলার বহু বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হিসাবে মৌসমকে চাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সুজাপুরও আছে। কিন্তু কোথায় দাঁড়াবে মৌসম, তা আমি এখনই বলব না। তাহলে অন্য বিধানসভাকেন্দ্রের কর্মীরা দুঃখ পাবেন।’
