মালদা: মালদার (Malda) কালীতলার নিস্তব্ধ রাত যখন ভোরের আলো দেখার প্রতীক্ষায় থাকে, ঠিক তখনই সাড়ে তিনটের অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে ১৬ বছরের এক কিশোরীর। পিঠে জ্যাভলিন নিয়ে সাইকেলে চেপে চার কিলোমিটার দূরে মালদা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের মাঠের দিকে রওনা দেয় সে। এটি কোনও সিনেমার গল্প নয়, বরং উত্তরবঙ্গের এক লড়াকু কন্যার বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। সে মিষ্টি কর্মকার- মালদার এক রেল হকারের মেয়ে, যে আজ ভারতের ‘গোল্ডেন গার্ল’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
মিষ্টির বাবা সঞ্জয় কর্মকার মালদা রেলস্টেশনে হকারি করেন। কোনওদিন আয় ৫০০ টাকা, কোনওদিন তারও কম। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে তিন সন্তানকে নিয়ে ছিল তাঁর জীবনযুদ্ধ। কিন্তু মিষ্টির চোখে ছিল অন্য এক নেশা। করোনাকালে যখন সারা পৃথিবী থমকে ছিল, তখন কোচ অসিত পাল খুঁজে পান এই প্রতিভাকে। প্রাক্তন স্প্রিন্টার অসিতবাবু বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়ের কবজিতে লুকিয়ে আছে বিশেষ শক্তি।
বাবা সঞ্জয় কর্মকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার সামর্থ্য ছিল না মেয়ের জন্য ভালো জুতো বা প্রোটিন ডায়েট জোগাড় করার। কিন্তু ওর জেদ দেখে আমিও হাল ছাড়িনি। ধারদেনা করে আর পাড়াপ্রতিবেশীর সাহায্য নিয়ে ওর পাসপোর্ট করিয়েছিলাম। আজ যখন ও বিদেশে ভারতের জার্সি পরে খেলে, তখন মনে হয় আমার কষ্ট সার্থক।’
মিষ্টির প্রতিভা প্রথমবার জাতীয় স্তরের নজরে আসে যখন সে বিহারের পাটনায় অনুষ্ঠিত ২০তম ন্যাশনাল ইউথ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৫.০২ মিটার দূরত্বে জ্যাভলিন ছুড়ে স্বর্ণপদক জয় করে। এটি ছিল ওই ইভেন্টে বাংলার একমাত্র সোনা। এর পরেই তার ডাক আসে ভারতীয় জাতীয় দলে। এপ্রিলে সৌদি আরবের দাম্মামে এশিয়ান অনূর্ধ্ব-১৮ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় মিষ্টি। বিমানে চড়ার সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আজও আপ্লুত সে।
কোচ অসিত পালের কথায়, ‘মিষ্টি খুবই সময়নিষ্ঠ এবং পরিশ্রমী। ভোররাত থেকে ওর অনুশীলন শুরু হয়। আমি ওর বাবাকে কথা দিয়েছিলাম ওকে ইন্ডিয়া অ্যাথলিট তৈরি করব। আমরা চাই ও নীরজ চোপড়ার মতো ভারতের নাম উজ্জ্বল করুক।’
বর্তমানে মিষ্টি জলপাইগুড়ির সাই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ২০২৬-এর মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি সমানতালে চলছে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের লড়াই। মালদা রেল হাইস্কুলের এই ছাত্রী এখন কেবল জেলার নয়, গোটা রাজ্যের অনুপ্রেরণা।
সাফল্য সম্পর্কে মিষ্টির নিজস্ব দর্শন অত্যন্ত সরল, কিন্তু গভীর : ‘আমার স্বপ্ন শুধু সোনা জেতা নয়, ভারতের তেরঙা-কে বিশ্বের দরবারে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে ধরা। আর্থিক সমস্যা চিরকালই ছিল, কিন্তু জ্যাভলিন যখন হাতে থাকে, তখন আমি সব ভুলে যাই। শুধু সামনে থাকা লক্ষ্যটাকেই দেখি।’
উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে আসা এই প্রতিভা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সঠিক প্রতিভা এবং অদম্য জেদ থাকলে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েও আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন সত্যি করা যায়।
