অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: ‘দেশের জন্য লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন। আর আমি মানুষকে বাঁচাতে একটু রক্ত দিতে পারব না!’ বহু বছর ধরে রক্তদানের পেছনে কোন বিষয়টি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে জানতে চাইলে এ কথাই বললেন ঝন্টু রায়। গত ২৫ বছরে ঝন্টু ৫৬ বার রক্তদান করেছেন। পেশায় গ্রাম পঞ্চায়েতের সহায়ক বছর সাতচল্লিশের ঝন্টু ময়নাগুড়ির (Mainaguri) সুভাষনগরপাড়ার বাসিন্দা। সমাজসেবায় এক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
রক্তদানের শুরুটা কীভাবে? ঝন্টু জানালেন, সালটা ছিল ২০০১। তিনি ছিলেন পাড়ার ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাবের সম্পাদকের দায়িত্বে। ক্লাবের তরফে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হলে সেখানে ‘ভয় কাটিয়ে’ প্রথমবার রক্তদান। এরপর থেকে আর সমস্যা হয়নি। নির্দিষ্ট সময় অন্তর যেখানেই রক্তদান শিবিরের আয়োজন হয়েছে, সেখানেই ছুটে গিয়ে রক্ত দিয়েছেন ঝন্টু। ঝন্টু বলেন, ‘রক্তদানের কারণে একজন মানুষের জীবন বাঁচে, এটা মনে একধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। এই মানসিক শান্তির সঙ্গে কোনও কিছুর তুলনা হয় না। প্রতি তিন–চার মাসে একবার রক্ত দেওয়ার চেষ্টা করি।’
শুধু শিবিরে গিয়ে রক্তদান করাই নয়, মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তদান করতেও বহুবার ডাক পড়েছে। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে রক্ত দিয়ে এসেছেন। ময়নাগুড়ির রেল দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে একাধিক জরুরি পরিস্থিতিতে নিজে থেকেই উদ্যোগী হয়ে ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে রক্তদান করেছেন ঝন্টু। অন্যদেরও রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি।
গত কয়েক বছরে একাধিক ক্লাব, সংগঠনের মাধ্যমে দুশোর বেশি রক্তদান শিবিরের আয়োজনে সহায়তা করেছেন ঝন্টু৷ এখন রক্তদানের ব্যাপারে একাধিক স্কুল-কলেজ থেকেও পড়ুয়াদের সচেতন করতে ঝন্টুর ডাক আসে৷
এসবের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও করেছেন ঝন্টু। গত কয়েক বছরে একাধিক রক্তদান শিবিরে থেকে ঝন্টু রক্তদাতাদের নাম, ব্লাড গ্রুপ, ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে একটি ডেটা ব্যাংক তৈরি করে ফেলেছেন। এই ডেটা ব্যাংকে ময়নাগুড়ি ছাড়াও গোটা জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের তথ্য রাখা রয়েছে। কখনও ব্লাড ব্যাংকে রক্তের অভাব থাকলে ডেটা ব্যাংক থেকে তথ্য নিয়ে নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তদাতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে অনেকেই রক্তদাতার সন্ধান পেয়ে রোগীকে বাঁচাতে পারছেন।
ঝন্টুর কথায়, ‘রক্ত এমন একটি জিনিস যা কারখানায় কিংবা ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয় না। কেবলমাত্র মানুষই পারে রক্তদান করে রক্তের ঘাটতি মেটাতে। মানুষের মধ্যে রক্তদান নিয়ে এখনও অনেক ভীতি, কুসংস্কার রয়েছে। রক্তকে নিয়ে ব্যবসার পাশাপাশি দালালরাজ চলে বিভিন্ন স্থানে। ২০১৪ সালের অগাস্ট পর্যন্ত ব্লাড ব্যাংকে কতটা রক্ত রয়েছে তার তথ্য পাওয়া যেত না। ব্লাড ব্যাংকের এক বৈঠকে এর জোরালো প্রতিবাদ করি আমি। তারপর থেকে প্রতিদিন জলপাইগুড়ি ব্লাড ব্যাংকের রক্তের পরিমাণের তালিকা প্রকাশ করা হয়।’
