লাটাগুড়ির নাম নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি মূলত প্রকৃতির সঙ্গেই জড়িত। অনেকের মতে, একসময় এই এলাকা জঙ্গল অর্থাৎ লতাপাতায় ভরা ছিল। সেই থেকে ‘লতাগুড়ি’ নাম। পরবর্তীতে বিবর্তন হয়ে যা ‘লাটাগুড়ি’ রূপ নিয়েছে।
শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি: অপভ্রংশ বা বর্ণবিপর্যয়ে নাম বদলে গিয়েছে, এমন উদাহরণ তো ভূরিভূির। কিন্তু ইংরেজি বানানের জন্য বাংলা নামটাই বদলে যাওয়া- এমন ঘটনা সত্যিই বিরল। ঠিক এমনটাই বোধহয় ঘটেছে লাটাগুড়ির (Lataguri Historical past) ক্ষেত্রে।
উত্তরবঙ্গের লাটাগুড়ি বর্তমানে শুধু রাজ্য বা দেশ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও এখন পরিচিত নাম। একসময় ঘন জঙ্গল থাকলেও ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছে। তবে এত পরিচিত এই জনপদের নাম নিয়ে বিভিন্ন মত ও প্রচলিত ধারণা রয়েছে।
লাটাগুড়ি নামকরণ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি মূলত প্রকৃতির সঙ্গেই জড়িত। অনেকের মতে, একসময় এই এলাকা জঙ্গল অর্থাৎ লতাপাতায় ভরা ছিল। সেই ‘লতা’ শব্দ থেকেই একসময় এই এলাকার নাম হয় লতাগুড়ি। পুরোনো দলিল-দস্তাবেজে এখনও অনেকসময় সেই ‘লতাগুড়ি’-র উল্লেখ পাওয়া যায়। ইংরেজিতে ‘লতা’ আর ‘লাটা’ বানান একই হওয়ায় সম্ভবত বিভ্রাটের শুরু। লোকমুখে ইংরেজি বানান অনুযায়ী উচ্চারণের জেরে লতাগুড়ি একসময় লাটাগুড়ি হয়ে যায়।
লাটাগুড়ির প্রবীণ বাসিন্দা ও নাট্যকার কমল ভৌমিক বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ইংরেজ আমলের পুরোনো সরকারি নথিপত্রে ‘লতাগুড়ি’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এই তত্ত্বকে কিছুটা শক্তি জোগায়।’ সাহিত্যিক গৌরীশংকর ভট্টাচার্য সহমত পোষণ করে জানান, লতাগুল্ম ঘেরা এই অঞ্চলের নাম লতাগুড়ি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
অন্যদিকে, আরেকটি ভিন্ন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় রাজবংশী ভাষায় ‘লাঠা’ শব্দের অর্থ গাছের মোটা গুঁড়ি। অতীতে এই অঞ্চলে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ছড়িয়ে থাকত। এলাকায় প্রায় ৩৫টির বেশি কাঠের মিল থাকায় সেখানে নিয়মিত গাছের গুঁড়ি কাটা ও মজুত করা হত। স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমী দিব্যেন্দু দেবের মতে, ‘এই লাঠা শব্দ থেকে লাটাগুড়ি নামের উৎপত্তি হতে পারে।’
অতীতে লাটাগুড়ি কাঠের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এলাকাজুড়ে অসংখ্য কাঠের মিলের রমরমা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বন দপ্তরের বিভিন্ন বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ায় একে একে সেই মিলগুলি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের অর্থনীতির মোড় পর্যটনের দিকে ঘুরে যায়। ঝোপঝাড়, বিশাল শাল-সেগুন গাছ আর সবুজে মোড়া মাল মহকুমার এই ছোট্ট জনপদ নতুন পরিচয় খুঁজে পায় প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণকেন্দ্র হিসেবে।
তবে এতসব মত ও ব্যাখ্যা থাকলেও লাটাগুড়ির নামকরণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস এখনও অধরাই। হয়তো কোনও প্রাচীন দলিল বা লোকস্মৃতির ভাঁজে এর প্রকৃত উত্তর লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার অভাবই যেন এই জনপদের নামকে ঘিরে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোককথার মিশেলে গড়ে ওঠা লাটাগুড়ি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক—যার নামের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অতীতের বনজ স্মৃতি, মানুষের বসতি গড়ার গল্প ও সময়ের বিবর্তনের ছাপ।
