জয় মণ্ডল, নিউ ইয়র্ক: কথায় আছে, ঈশ্বরের স্পর্শে নাকি অলৌকিক ঘটনা ঘটে! আর ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসিকে তো ঈশ্বরই বলা হয়। আজ থেকে ঠিক ১৯ বছর আগে, সেই ফুটবল ঈশ্বরের এক স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়েছিল পাঁচ মাসের এক শিশু (Lamine Yamal)। আর সেই ঐশ্বরিক স্পর্শ থেকেই যেন জন্ম নিল এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। আজ আপনারা যে ছবিগুলো দেখছেন, তা কেবল কোনও সাধারণ ফ্রেম নয়, বরং সময় আর ভাগ্যের এক জাদুকরি মেলবন্ধন।
একটু ভালো করে খেয়াল করুন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাস। বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পের স্টেডিয়ামের অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুম। একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের স্নানের গামলা, সাবানজলে ভাসছে ফুটফুটে এক শিশু। আর তাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে স্নান করাচ্ছেন লাজুক চেহারার বছর কুড়ির এক তরুণ। তরুণটি লিওনেল মেসি, আর সেই পাঁচ মাসের শিশুটির নাম লামিনে ইয়ামাল!
এই ছবিটা আসলে ছিল একটা চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের অংশ। ইউনিসেফ এবং স্প্যানিশ পত্রিকা ‘দিয়ারিও স্পোর্ত’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক লটারিতে জিতে বার্সেলোনার এক তারকার সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিল মাতারো শহরের এক সাধারণ পরিবার। ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট আজও সেই দিনের কথা ভাবলে শিউরে ওঠেন। তাঁর স্মৃতিতে, ‘মেসি তখন ভীষণ লাজুক। ড্রেসিংরুমে ঢুকে জলের টাব আর একটা একরত্তি বাচ্চাকে দেখে সে তো রীতিমতো ঘাবড়েই গিয়েছিল! কীভাবে বাচ্চাটাকে ধরতে হবে, সেটাই বুঝতে পারছিল না।’ শেষপর্যন্ত ইয়ামালের মা শিলা এভানার সাহায্যে বেশ কসরত করে ফ্রেমবন্দি করা হয় মুহূর্তটিকে। মনফোর্ট ঘাম ঝরিয়ে যে ছবিটা তুলেছিলেন, তখন কি ঘুণাক্ষরেও কেউ ভেবেছিল, ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য এই শিশুটিই একদিন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাঁরই মুখোমুখি হবে?
সময় নিজের ছন্দে গড়িয়েছে। মেসি আজ আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী, ফুটবল গ্রহের অবিসংবাদিত সম্রাট। অন্যদিকে, সেই স্নানটাবের শিশুটি এখন সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন জাদুকর। কাকতালীয়ভাবে, বার্সেলোনায় মেসির ফেলে যাওয়া ১০ নম্বর জার্সিটাই এখন ইয়ামালের গায়ে। গত ইউরো কাপে স্পেনের জয়ের অন্যতম কারিগর এই তরুণই এখন তাঁর দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা।
রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসতে চলেছে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মহারণ। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। অর্থাৎ, একদিকে ৩৯ বছরের মেসি, অন্যদিকে ১৯ বছরের ইয়ামাল। প্রায় দুই দশক আগে যে মানুষটার স্নেহের স্পর্শ পেয়েছিল, আজ বিশ্বজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নিতে সেই ফুটবল দেবতাকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে সে!
ছবিটা প্রথম প্রকাশ্যে আসে বছর দুয়েক আগে, যখন ইয়ামালের বাবা সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি পোস্ট করে লিখেছিলেন- ‘দুই কিংবদন্তির শুরু।’ ফোটোগ্রাফার মনফোর্টের মতে, এরকম ঘটনা লটারি জেতার চেয়েও বিরল। আধুনিক ফুটবলে যেখানে শুধুই টাকা আর ক্ষমতার দাপট, সেখানে এমন একটা নিখাদ রূপকথার গল্প সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে যখন এই দুই প্রজন্মের জাদুকর বল পায়ে নামবেন, তখন হয়তো ফুটবল দেবতা অলক্ষে মুচকি হাসবেন। কারণ, নিয়তি তার সেরা ম্যাজিকটা যে লুকিয়ে রেখেছিল ওই ছোট্ট প্লাস্টিকের গামলাতেই!

