সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: ধারেকাছে একটু গঞ্জ ধরনের জায়গা বলতে আমিনপুর। সেখান থেকে টোটোয় সওয়ার হয়ে রাজ্য সড়ক ধরে আরও প্রায় ৪ কিলোমিটার গেলে তবে পৌঁছানো যাবে পইনালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পুরোনো এই স্কুলের একতলায় সিঁড়ির নীচে যে ছোট্ট ৩ ফুট বাই ৫ ফুট মতো জায়গা ছিল, সেটাই বদলে দিল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমণ্ডি ব্লকের এই স্কুলটাকে (Kushmandi)। আদতে একটা দোকান। সেখান থেকে খাতা, পেন, পেন্সিল কিনতে পারবে পড়ুয়ারা। তাহলে আর বিশেষত্ব কী হল? বিশেষত্ব হল ভাবনায়। এখানে পড়াশোনার সামগ্রী মিলবে কম দামে (Reasonably priced college provides)। কারণ, ভরতুকি দেবেন শিক্ষকরা। আর এই কেনাবেচার পুরো দায়িত্বটা সামলাবে দুই খুদে মন্ত্রী। স্কুলের শিক্ষা সংসদের প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি মিস্ত্রি এবং শিক্ষামন্ত্রী সারিকা পারভিন নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে এই গুরুভার। স্টক রেজিস্টার মেলানো থেকে ক্যাশবুকে কীভাবে হিসাবনিকাশ করতে হয়, সেসব তাদের শিখিয়ে দিয়েছেন শিক্ষকরাই। দোকান থেকে এই কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না কোনও শিক্ষক।
এই প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া ১৬৫ জন। আর শিক্ষক জনা চারেক। কৃষিপ্রধান এলাকা। পড়ুয়ারা প্রায় সকলেই দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। আর তাদের মধ্যে অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াও বটে। সরকারি উদ্যোগে বই-খাতা মেলে বটে, তবে হঠাৎ প্রয়োজনে পেন-পেন্সিল, মোমরঙের পেন্সিল মিলবে কোথায়? ব্যস্ত বাবা-মায়েদের পক্ষে দূরের দোকানে যাওয়া সব সময় সম্ভব নয়। সেইসঙ্গে দামের ব্যাপারটা তো রয়েছেই। স্কুলের শিক্ষক মোস্তফা আল মামুন বলছিলেন, ‘মাঝারি মানের দিস্তা খাতা, যেটা বাজারে দাম নেবে ১২ টাকা, সেটা স্কুলের দোকানে মিলবে সাড়ে ৯ টাকায়। দোকানে কিনতে গেলে যে কলমের দাম ৫ টাকা, সেটার দাম এখানে ৪ টাকা। ছবি আঁকার খাতা স্কুলের দোকানে ১২ টাকায় পাওয়া যাবে। বাজারে তার দাম ১৫ টাকা।’
আরেক শিক্ষক সুদীপ্ত সর্দারের কথায়, ‘ছাত্রছাত্রীদের বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক খাতা, নানা ধরনের পেন, পেন্সিল, রাবার, ইরেজার, ছবি আঁকার খাতা, মোম পেন্সিল বিক্রি করা হবে এখান থেকে।’ আপাতত হাজার সাতেক টাকার সামগ্রী কেনা হয়েছে।
কেন এই উদ্যোগ? স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাজেদার রহমান অতীতে শিক্ষারত্ন সম্মান পেয়েছেন। সেই সাজেদার বলছিলেন, ‘গ্রাম থেকে কুশমণ্ডি বাজার প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে। আশপাশে ছোট জনপদগুলিতে বই-খাতার দোকান থাকলেও সব সময় সবকিছু পাওয়া যায় না। আবার সমস্ত অভিভাবক সচ্ছল একথা বলা যায় না। তাই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ সমস্যার কথা মানছেন অভিভাবক সঞ্জিত মিস্ত্রিও। বললেন, ‘অনেক সময় মেয়ে খাতা আনার কথা বলে বটে, কিন্তু আমার ভুল হয়ে যায় কোনও কোনও দিন। এখন আর অসুবিধা হবে না।’
কতক্ষণ খোলা থাকবে এই দোকান? প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, ১০টা ৫০ মিনিটে প্রার্থনা শেষ হওয়ার পর থেকে ১১টা ২০ পর্যন্ত, আর টিফিন পিরিয়ডে খোলা থাকবে দোকান। আগামীতে সবকিছুর সঙ্গেই মূল্য লেখা থাকবে। সেখানেই থাকবে টাকা রাখার পাত্র। ন্যায্য মূল্য দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই সেই জিনিস কিনবে।
বুধবার অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফিতে কেটে দোকানের সূচনা করেন দুই অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক সায়েম রেজা ও সাফিয়ার রহমান। সায়েম বলেছেন, ‘এমন উদ্যোগ অভিনব। নিজেরা দেখেশুনে, নিজের পছন্দের খাতা-কলম কেনার মধ্য দিয়ে একটা মূল্যবোধ তৈরির পাঠ পাবে ছাত্রছাত্রীরা।’
এমন অভিনব উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন কুশমণ্ডি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উমাশংকর সরকার, শমশিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অর্ধেন্দু চৌধুরীরাও। উমাশংকর বলেন, ‘শিশুমনের বিকাশে এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।’

