রণজিৎ ঘোষ, কালিম্পং: দু’হাতে দুটো বড় জেরিক্যান। দুটিই জলভর্তি। দু’হাতে দুই জেরিক্যান হাতে পাহাড়ের চড়াই উতরাই ভাঙছেন প্রমীলা থাপা। কালিম্পংয়ের (Kalimpong) ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ডিবি গিরি রোডে বাড়ি। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। দু’বেলা তাঁকে বাগধারা থেকে ঝরনার জল সংগ্রহ করতে হয়।
এই বয়সে এত কষ্ট! জল ভরার ফাঁকে আক্ষেপ ঝরে পড়ছিল তাঁর, ‘জীবনটা ঝোরা থেকে জল টানতে টানতেই কেটে যাবে। বাড়িতে ইচ্ছেমতো জল খরচ করা হয়তো এ জীবনে দেখে যেতে পারব না।’ একা প্রমীলা নন, জলসমস্যায় জেরবার কালিম্পং শহর।
প্রমীলাকে দু’হাতে জলের জেরিক্যান নিয়ে মেলা ময়দানের পাশের রাস্তা দিয়ে ডম্বরচকে ওঠার সময় আরেক স্থানীয় বাসিন্দা চটজলদি বললেন, ‘এবার ভোটের সময় নেতারা বাড়িতে এলে বলে দেবেন, আগে জল দিন, তারপর ভোট দেব।’ শুধু কালিম্পং শহর নয়, আশপাশের গ্রামের সবাইকে প্রতিদিন দেড়-দুই কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা ডিঙিয়ে ঝোরা থেকে জল আনতে হয়।
সেই জলেরই বা নিশ্চয়তা কোথায়! শীত বিদায় নিতে ঝোরায় জল কমতে শুরু করেছে। শুধু কী আর জলের সমস্যা? না আছে যাতায়াতের ভালো রাস্তাঘাট, না আছে দৈনিক রুজিরুটির সংস্থান। ভালো চিকিৎসার দরকার হলে গন্তব্য সেই প্রায় ৭০ কিলোমিটার নীচে শিলিগুড়ি। অথচ স্বাধীনতার ৭৮ বছর পার, কালিম্পং জেলা গঠনের ১০ বছর হয়ে গেল। এই আবহে দাবি উঠছে, কালিম্পংকে হয় সিকিমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হোক নতুবা পূর্ণাঙ্গ জেলা পরিষদ গঠন করা হোক।
এই দাবির পক্ষে সওয়াল করছে কালিম্পং সিটিজেন্স ফোরাম। যে সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক হরকাবাহাদুর ছেত্রী। তাঁর অনুগামীরা মনে করেন, সিকিমের সঙ্গে সংযুক্তি কালিম্পংয়ের উন্নয়নের একমাত্র পথ। ভোট নিয়ে তাই চর্চাই নেই কালিম্পংয়ে। ডেলোর রাস্তায় এক চায়ের আড্ডায় এলাকার তরুণ রাজেশ ছেত্রী বললেন, ‘ভোট-টোট নিয়ে আমরা ভাবি না। আমাদের তো কোনও উন্নতি হবে না। শের কভি নিরামিষ নেহি খাতা। যো শের বনেগা, ওহি লুটপুটকে খায়েগা।’
গ্রামগুলির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সেভাবে তৈরি হয়নি। জল জীবন মিশন, জলস্বপ্ন, আম্রুত নামে প্রচুর জলের প্রকল্প রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তৃষ্ণা মেটাতে ভরসা সেই ঝোরা বা ঝরনার জল। এই না পাওয়ার কষ্ট কালিম্পংয়ের ভোট অঙ্ককে এবার জটিল করে তুলছে। কোনও এক প্রার্থীর আর ঢালাও ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই ‘ল্যান্ড অফ অর্কিড’-এ।
ডম্বর চকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের সামনের ক্যাফেটেরিয়ায় কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী পেনজো ভুটিয়া সাফ বললেন, ‘এবার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার (বিজিপিএম) জয় সহজ হবে না।’ তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘বিজিপিএম-এর মাটি শক্ত নয় বুঝেই কালিম্পংয়ে পুরভোট না করিয়ে প্রশাসক বসিয়ে রেখেছে।’
কালিম্পংয়ের চোরা বাটোতে পেনজোর কথারই প্রতিধ্বনি যেন। স্থানীয় বিধায়ক রুদেন সাদা লেপচা আপাদমস্তক ব্যবসায়ী। দুর্গম গ্রাম সিংজির বাসিন্দা রাজনীতিতে আনকোরা রুদেনকে ২০২১ সালে অনীত থাপা প্রার্থী করেছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি সেবার রুদেনকে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি কিছু করেছেন বলে তাঁর গ্রামের মানুষও বলতে পারেন না।
আম্রুত-২ প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে বলে রুদেন দাবি করলেও নেহরু রোডে স্থানীয় ব্যবসায়ী রমেন কার্কি শোনালেন ভয়াবহ পরিস্থিতি। তাঁর কথায়, ‘সপ্তাহে দু’-তিনদিন পাইপলাইনে জল আসে। সেজন্য সরকারি কর্মীদের মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। মাঝেমধ্যে জলের গতি কমিয়ে বাড়তি টাকা চাওয়া হয়। সবাই সবকিছু জানে, কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না।’
বিজিপিএম-এর ওপরে যেমন মানুষের ক্ষোভ রয়েছে, তেমনই বিজেপির ওপর সন্তুষ্ট নয়। রুদেনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনীত তাঁকে ফের প্রার্থী করবেন বলে খবর ভাসছে। বিজেপি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেবে, নাকি আঞ্চলিক দলকে সমর্থন করবে, তা এখনও অনিশ্চিত। বিজেপির সহযোগী দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা কালিম্পং আসনটি দাবি করছে।
ডম্বরচকে দাঁড়িয়ে ইউসুক সিমিক বলছিলেন, মোর্চা নেতা সোনম ইয়াকা প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। আবার অজয় এডওয়ার্ডও (আইজিজেএফ) প্রার্থী দেবেন জানিয়েছেন। অজয়ের দলের নেতারা চাইছেন প্রাক্তন বিধায়ক হরকাবারাদুর আইজিজেএফ-এর হয়ে লড়ুন। হরকার সঙ্গে নাকি কথাবার্তা এগিয়েছে।
কালিম্পংয়ে হরকাবাহাদুরের কিছু প্রভাব এখনও আছে। তিনি প্রার্থী হলে ভোট কাটাকাটির অঙ্কে অবশ্য রুদেন সুবিধা পেয়ে যাবেন। শেষপর্যন্ত যারই জয় হোক, কালিম্পংয়ের উন্নয়নের মুক্তির পথ স্থানীয়দের অজানাই।
