রণজিৎ ঘোষ, কালিম্পং: কালিম্পং, পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম গন্তব্যস্থল হিসাবে পরিচিত। কিন্তু এই কালিম্পং (Kalimpong) শহরই কার্যত পর্যটকহীন অবস্থায়। বরং এই শহরকে ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করে পর্যটকরা জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চল এবং পেলিং সহ সিকিমের পর্যটনস্থলগুলিতে চলে যাচ্ছেন। কারণ একটাই, কালিম্পং শহরে দু’রাত থেকে এখানে ঘোরার মতো তেমন দর্শনীয় পর্যটনস্থল নেই। এই পরিস্থিতির মধ্যে কালিম্পং শহরের অর্থনীতি ক্রমশ নিম্নগামী। হোটেল ও রেস্টুরেন্টে তেমন ভিড় জমছে না, বাজারগুলিতেও ভিড় নেই। এমন পরিস্থিতিতে কালিম্পংয়ের সুদিন ফেরাতে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের দাবি উঠছে। কালিম্পং জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, ‘কালিম্পংয়ের পর্যটন নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। ২০২৭ সালের মধ্যে কালিম্পংয়ের পর্যটনের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।’
দার্জিলিংয়ের মতো কালিম্পংয়েও একটা সময় পর্যটকের ভিড় জমত। সেদিকে নজর রেখে কালিম্পং পাহাড়ের গায়েও প্রচুর হোটেল, রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই শহরে হোটেলের সংখ্যা প্রায় ১৫০টির কাছাকাছি। একটা সময় শহর থেকে পর্যটকরা ডেলোর পাশাপাশি লাভা, লোলেগাঁও, পেডং, ন্যাওড়াভ্যালি জাতীয় উদ্যান সহ বিভিন্ন জায়গায় ছুটে যেতেন। এর জন্য দু’-তিনদিনের কালিম্পং সফর কার্যত পর্যটকদের বাধা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে লাভা, লোলেগাঁও, পেডংয়ের মতো পর্যটনস্থলগুলিতেও প্রচুর হোটেল, হোমস্টে তৈরি হয়ে গিয়েছে। এমনকি ডেলো পর্যটন আবাসের চারিদিকেও প্রচুর হোমস্টে এবং ছোট, বড় হোটেল তৈরি হয়েছে। ফলে পর্যটকরা এখন সরাসরি কালিম্পং শহরকে ছুঁয়ে ওই গন্তব্যগুলিতে চলে যাচ্ছেন।
কালিম্পং শহরকেও পর্যটন ডেস্টিনেশন হিসাবে তুলে ধরার দাবিতে সরব হয়েছেন হোটেল মালিক থেকে বিভিন্ন সংস্থার কর্তারা। কালিম্পংয়ের ডম্বর চকে দাঁড়িয়ে থিংকার্স অফ কালিম্পংয়ের কর্তা সিবি গুরুং বলছিলেন, ‘শহরটা যানজটে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট থাকছে। আট মাইল থেকে শুরু করে গোটা শহরই যানজটে অবরুদ্ধ। এখানে পর্যাপ্ত পার্কিং জোন তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এখানকার পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।’ কার্যত একই বক্তব্য শোনা গেল এখানকার ব্যবসায়ী পেনজো গম্বু ভুটিয়ার গলায়। তাঁর বক্তব্য, ‘পর্যটকদের রুচি, মানসিকতার বদল হচ্ছে। এখন পর্যটকরা পাহাড় বেড়াতে এসে শুধু ঘোরাঘুরি পছন্দ করেন না। একটু নিরালায় বসে সময় কাটাতে চান। কিন্তু এই যানজটের শহরে তা সম্ভব হচ্ছে না।’ তাঁর মতো অনেকেই মনে করেন, ডম্বর চক থেকে থানাডারা পর্যন্ত রাস্তাটিকে গ্যাংটকের এমজি মার্গ বা দার্জিলিংয়ের ম্যালের মতো তৈরি করা প্রয়োজন। অর্থাৎ এই রাস্তাটুকু থেকে সমস্ত যানবাহনের পার্কিং সরিয়ে এটিকে সাজিয়ে তুলে এখানে বসার ব্যবস্থা করা দরকার।
হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ কালিম্পংয়ের সভাপতি সিদ্ধান্ত সুদের বক্তব্য, কালিম্পং শহরে এমন অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেগুলি ঘুরে দেখতেই পর্যটকদের দু’দিন কেটে যাবে। কিন্তু সঠিক প্রচারের অভাবে পর্যটকরা সেগুলি জানতে পারছেন না। তাঁর বক্তব্য, ‘এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গৌরীপুর ভবন রয়েছে। যেখানে কবিগুরু একাধিকবার এসেছেন। সেটিকে হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানকার বনাঞ্চলই সবচেয়ে বড় সম্পদ। বনের মধু, পাখি পর্যবেক্ষণ, লেপচা মিউজিয়াম সহ আরও প্রচুর দর্শনীয় স্থান রয়েছে।’ এমন ডেস্টিনেশন তুলে ধরার জন্য জেলা প্রশাসন এবং পর্যটন দপ্তরের সঙ্গে মিলে ডিজিটাল প্রোমোশনের দিকে তাঁরা জোর দিচ্ছেন বলে জানান সিদ্ধান্ত। এর ফলে নতুন করে কালিম্পং শহর পর্যটকদের ডেস্টিনেশন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল প্রত্যেকেই।
