তিতাস পাল, জলপাইগুড়ি: নিঝুম রাতে রাজপ্রাসাদের অন্ধকার চিরে ভেসে আসা নূপুরের নিক্কন আর এক রহস্যময় নারীমূর্তির অদৃশ্যে হারিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর লোককথা আজও জীবন্ত উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির (Rajbari) নাটমন্দিরে। জনশ্রুতি বলে, চঞ্চলা দেবী প্রতি রাতে নাটমন্দির ছেড়ে অনতিদূরের গহীন জঙ্গলে থাকা ডাকাত কালী মন্দিরে চলে যেতেন। দেবী যাতে রাজপরিবারের সীমানা ছেড়ে বাইরে না যান, সেই বিশ্বাস থেকেই একসময় প্রতিমার চরণে পরানো থাকত ধাতব বেড়ি বা শেকল। নিস্তব্ধ রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে লোককথা ও আদিম ইতিহাসের এই অপূর্ব মেলবন্ধন আজও অটুট রয়েছে।
রাজপরিবারে দেবী ‘জয়কালী’ নামে নিত্য পূজিতা বা নেত্যকালী রূপ ধারণ করে রয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত আরাধনা করা হয়। বছরভর চারবার বড় মাত্রায় পুজোর আয়োজন হলেও প্রধান আকর্ষণ থাকে দীপান্বিতা অমাবস্যার (Kali Puja 2026) বিশেষ তিথি। এই রাতে দেবীকে ভোজ হিসেবে নিবেদন করা হয় পোলাও, অন্ন এবং পঞ্চব্যঞ্জন সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পদ। বলিপ্রথার পাঁঠার মাংসও দেবীকে দেওয়া হয়।

প্রাসাদের মূল সিংহদ্বার পেরিয়ে ভেতরে এগোলেই চোখে পড়ে দুর্গামণ্ডপ এবং তার সংলগ্ন নাটমন্দির। সেখানে বেদিমঞ্চে ধাতুর তৈরি জয়কালী বিগ্রহের সঙ্গে স্থান পেয়েছে ডাকিনী-যোগিনী এবং রক্তমুখী শিয়াল। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে এই বিগ্রহটি রাজবাড়ির দীঘির পাড়ে অবস্থিত মন্দিরে ছিল এবং বর্তমান নাটমন্দিরে বৈকুণ্ঠদেব অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজপরিবারের এক পূর্বতন সদস্য প্রতিভা বসু স্বপ্ন দর্শন পেয়ে দেবীকে নাটমন্দিরে স্থানান্তর করেন এবং বৈকুণ্ঠদেবকে অন্দরমহলে স্থান দেওয়া হয়। কালিকা পুরাণ মতে পরিচালিত এই বিশেষ পুজোর সঙ্গে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এর ভবানী পাঠক এবং রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেবী চৌধুরানী এখানে পুজো দিতেন বলে লোকমুখে বহুল প্রচলিত।

