সমীর দাস, হ্যামিল্টনগঞ্জ: বদলাতে থাকা সময়ে পালটে যায় অনেক কিছুই। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের উত্তরণে ফিকে হয় স্মৃতি, মুছে যায় ইতিহাস, বদলে যায় পরিবেশ। কিন্তু, আর সবকিছু পালটালেও, কমেনি হ্যামিল্টনগঞ্জের কালীপুজোর মেলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ (Kali Puja 2025)।
সামনেই কালীপুজো। হ্যামিল্টনগঞ্জের কালীপুজোর মূল আকর্ষণই হল তার মেলা। এবছর যা ৯১তম বর্ষে পা রাখতে চলেছে। কালীপুজোর মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের নস্টালজিয়া অক্ষুণ্ণ থেকেছে বর্তমান সময়েও।
হ্যামিল্টনগঞ্জের বিশিষ্ট প্রবীণ নাগরিক কৃষ্ণপদ বসুবলকে মেলা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতেই তাঁর গলা আবেগতাড়িত হয়ে উঠল। স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানালেন, ছোটবেলায় মা-বাবার হাত ধরে তিনি মেলায় ঘুরতে আসতেন। আজ, সেই জায়গায় তিনি নাতি-নাতনির সঙ্গে মেলা দেখতে আসেন।
সেই ইংরেজ আমলে ইউরোপীয় সাহেবদের সহযোগিতায় এই কালীপুজো ও মেলার গোড়াপত্তন হয়েছিল। আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ওই মেলার জন্যই হ্যামিল্টনগঞ্জের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে ডুয়ার্সের এই প্রাচীন মেলা সম্পর্কে জানা গেল অনেক কিছু। ১৯১৭ সালে এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সরোজিৎ মজুমদার ও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মিলে কাঠের মন্দির বানিয়ে টিনের চালাঘরে কালীপুজো শুরু করেন। সেইসময় বক্সা ডুয়ার্স টি কোম্পানির ইউরোপীয় সাহেবরা কালীপুজোয় সহযোগিতা করেছিলেন। তখন মূলত ঝাড়খণ্ড থেকে চা বাগানের কাজের জন্য শ্রমিকদের আনা হত। তবে এলাকায় ছিল না শ্রমিকদের জন্যে আনন্দের ব্যবস্থা। যার ফলে তাঁরা এখানে থাকতে চাইতেন না। অন্যদিকে, চা বাগানগুলোতে দোকানপাট ছিল না বললেই চলে। সেজন্য, ইউরোপীয় সাহেবরা মেলার উদ্যোগ নেন। শুরু হয় মেলা। এতে শ্রমিকদের মনোরঞ্জন হত। মেলা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেন শ্রমিকরা। মেলার সূচনায় ইউরোপীয় সাহেব হ্যামিল্টনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তার নামেই পরবর্তীকালে এই জায়গার নামকরণ হয়। তাই এই মেলার গড়ে ওঠার সঙ্গে জায়গার নামকরণের সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে।
প্রতি বছর মেলা পরিচালনার জন্য মূল কমিটি অক্ষত রেখে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। মেলা পরিচালন কমিটির গত বছরের যুগ্ম সম্পাদক পরিমল সরকার বলেন, ‘আগামী ২-৩ দিনের মধ্যেই মেলা পরিচালনার নতুন কমিটি গঠন করা হবে।’ মেলা নিয়ে আবেগের সুর ভেসে ওঠে তাঁর কণ্ঠে। তিনি বললেন, ‘হ্যামিল্টনগঞ্জের মেলা আর পাঁচটা মেলা থেকে একেবারেই ভিন্ন। হ্যামিল্টনগঞ্জবাসীর কাছে ওই মেলা আবেগের অন্য নাম। আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষ মেলা নিয়ে সমানভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। কালীপুজোর পরদিন মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। ১২ দিন ধরে মেলা চলবে।’
বারোদিন ধরে এই মেলার জন্যেই সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন এলাকার মানুষ। কাশ্মীর থেকে মণিপুর, ভুটান-নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশের বিক্রেতারা মেলায় পসরা নিয়ে বসেন। আবার কালচিনি ব্লক ছাড়াও উত্তরবঙ্গের প্রায় প্রতি জেলার মানুষ মেলায় ঘুরতে আসেন। মেলা শুরুর কিছুটা সময় এখনও বাকি থাকলেও, ইতিমধ্যেই স্থানীয়দের মধ্যে এই নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।
