বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, কুমারগঞ্জ: দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই চারদিকে এখন শ্যামাপুজোর প্রস্তুতি চলছে (Kali Puja 2025)। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে চলছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কালীপুজো। এই কালীপুজোর কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। সব জায়গায় রাতেরবেলা পুজো হলেও পারিবারিক শ্মশানের পাশে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরে আজও প্রথা মেনে দিনের আলোয় দেবীর আরাধনা হয়।
এই মন্দিরে দেবীর মূর্তিটি কাঠের তৈরি। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, মূর্তিটির বয়স প্রায় পাঁচশো বছর। তাই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বিশ্বাস, তাদের বাড়ির পুজোর বয়স অন্তত পাঁচ শতাব্দী। পরিবারের সদস্যদের মতে, এই পুজো দিনাজপুর মহারাজার ভৈরবী পরিবারের পুজোর একটি অঙ্গ। বর্ধমান থেকে আগত কোটিশ্বর চট্টোপাধ্যায় প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই দক্ষিণাকালীর পুজো শুরু করেছিলেন। পরে ১২০৫ বঙ্গাব্দে এই পরিবারের জমিদারি পত্তনের পর থেকে পুজোর আয়োজন আরও বড় আকার ধারণ করে। বর্তমানে পরিবারের সকল সদস্য মিলে এই পুজোর ব্যয়ভার বহন করেন।
প্রাচীন প্রথা মেনে আজও এই মন্দিরে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় না। সন্ধ্যায় মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানো হয়। তবে সন্ধ্যাবেলা পুজো সেরে বাড়ি ফেরার আগে সেই প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, এই নিয়ম না মানলে গ্রামের অমঙ্গল ঘটবে। এছাড়া আজও পুজোর দিন মধ্যরাতে শিয়াল ডেকে শিবা ভোগ খাওয়ানোর রীতি রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এই প্রথা মেনে চললে দেবী সন্তুষ্ট হন এবং পরিবারে শান্তি বজায় থাকে।
পুজোর অন্যতম আয়োজক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘পুজোর দিন নাটক, কীর্তন ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকল গ্রামবাসীকে পুজোয় নিমন্ত্রণ জানানো হয়।’ তিনি জানান, এই পুজোর আয়োজন করতে প্রতি বছর তাঁদের প্রায় লাখ তিনেক টাকা খরচ হয়। পরিবারের সদস্য অসীম চট্টোপাধ্যায় ও দেবলীনা চট্টোপাধ্যায় জানান, এই মন্দিরে দেবী চিরস্থায়ী। সারাবছর মন্দিরে নিত্যপুজো হয়। দিনের আলোতে মায়ের পুজো হয়। বছরের পর বছর ধরে নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে এখানে পুজো হচ্ছে।
তবে এই মন্দিরকে ঘিরে গ্রামবাসীর মধ্যে নানারকম গল্প প্রচলিত রয়েছে। গ্রামবাসী জানান, বহুবার এই মন্দিরের মূর্তিটি চুরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আজ অবধি কেউ নিতে পারেনি। গ্রামের প্রবীণদের বিশ্বাস, যাঁরা এই মন্দিরে কোনও অপকর্মের চেষ্টা করেন, মা কালী তাঁদের শাস্তি দেন। আচার, ভক্তি ও লোকবিশ্বাস মিলে পাঁচ শতকের পুরোনো রামকৃষ্ণপুরের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কালীপুজো জীবন্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে।
