শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি: কালীপুজোর রাতে জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে আলো আর ঢাকের আওয়াজে গরুমারা লাগোয়া বনবস্তিগুলি মুখর হয়ে ওঠে। রামশাই, বুধুরাম, চটুয়া ও কালীপুরের মানুষ সন্ধ্যা নামতেই জঙ্গল পেরিয়ে জয় মুন্সি আদিবাসী ক্লাবে জড়ো হন। এখানে বনবস্তির একমাত্র কালীপুজো হয় (Kali Puja 2025)। কয়েক বছর আগে এই পুজোমণ্ডপ থেকে বাড়ি ফেরার পথে হাতির হামলায় এক দম্পতি প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পর পুজোর রাতে ভরসা এই মণ্ডপ। আলো আর মানুষের ভিড়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ভরসা পান। সারারাত পুজো ও প্রসাদ বিতরণে তাঁদের সময় কাটে। ভোরের আলো ফুটতেই বনবস্তিবাসী ফের ঘরমুখো হন।
জয় মুন্সি আদিবাসী ক্লাব-এর পুজো এবার ১৮তম বর্ষে পড়ল। পুজো কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ ওরাওঁ বলেন, ‘গোটা গ্রামের কাছে এই পুজো যেন মিলনক্ষেত্র। পুজোর দিন থেকে মেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া বেশ কয়েকদিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলে।’
ময়নাগুড়ি ব্লকের একেবারে শেষপ্রান্তে গরুমারা জঙ্গল লাগোয়া রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতে বেশ কয়েকটি বনবস্তি রয়েছে। গোটা গ্রামের মানুষ জয় মুন্সি আদিবাসী ক্লাবের পুজোয় শামিল হন। স্থানীয় ভেলুয়ারডাঙ্গা, চটুয়া, কালীপুর ও বুধুরাম বনবস্তির বাসিন্দাদের এই পুজোয় জঙ্গলের পথ ধরে আসতে হয়। এই পথে কখনও হাতি আবার কখনও চিতাবাঘ ও গন্ডার দাঁড়িয়ে থাকে। ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর কালীপুজো দেখে বাড়ি ফেরার পথে গাওনা ওরাওঁ ও কুমারী ওরাওঁ হাতির মুখে পড়ে প্রাণ হারান। তারপর থেকে পুজোমণ্ডপে যাওয়ার সময় বন্যপ্রাণী যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেজন্য সন্ধ্যা নামার আগে গ্রামের মানুষ মণ্ডপে হাজির হন।
এই পুজোর বিশেষত্ব, পুজোর রাতে বনবস্তির বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে ক্লাব প্রাঙ্গণে থেকে যান। চটুয়া বনবস্তির বাসিন্দা রত্নে খেড়িয়ার কথায়, ‘রাতে জঙ্গলের পথ দিয়ে বাড়ি ফেরা মোটেই সহজ নয়। ফেরার পথে মাঝেমধ্যে হাতি, চিতাবাঘ দাঁড়িয়ে থাকে। তাই পরিবার নিয়ে মণ্ডপে রাত কাটাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা বধুরাম, সুস্মিতা ওরাওঁরা জানান, সারা বছর তাঁদের একইরকম কাটে। সন্ধ্যা নামতেই তাঁরা ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। কিন্তু কালীপুজোর রাতটা কাটে অন্যভাবে। আলোর ঝলকানি আর ঢাকের তালে মণ্ডপমুখর হয়ে ওঠেন সকলে। কীর্তন, প্রসাদ খাওয়া ও সারারাতের পূজার্চনা মিলিয়ে বনবস্তির মানুষের কাছে কালীপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এক মিলনমেলা ও আনন্দের উৎসব। ভোরের আলো ফুটলে তাঁরা রাতের সুখময় স্মৃতি নিয়ে ঘরমুখো হন।
