পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: প্রোমোটারের দৌরাত্ম্যে উত্তরবঙ্গের একাধিক হেরিটেজ বাড়ি, মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে। কমিশনকে দিয়ে হেরিটেজ সম্পত্তি মেরামত করিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করাতে বাড়ির মালিক রাজি হচ্ছেন না। তাঁরা প্রোমোটারকে দিতেই বেশি আগ্রহী। এমনকি হেরিটেজ তালিকায় স্বীকৃত সম্পত্তির উত্তরসূরিরা বাড়ি প্রোমোটারের হাতে দিয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি কোচবিহারের পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে হেরিটেজ কমিশনের উদ্যোগে উত্তরবঙ্গের হেরিটেজ সম্পত্তি বিষয়ক একটি আলোচনাচক্র হয়। সেখানে হেরিটেজ বাড়ির মালিকদের এই প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। সেজন্য এবার থেকে কমিশন বাড়ি, মাঠ হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আগে মালিকের সম্মতি চাইবে। রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের উত্তরবঙ্গের একমাত্র সদস্য ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, ‘মালদা থেকে কোচবিহার পর্যন্ত শতাধিক বছরের পুরোনো ফাঁকা জমি, মাঠ, সৌধ ও বাড়ি- এগুলির তালিকা প্রাথমিকভাবে করা হয়েছে। হেরিটেজ স্বীকৃতি আদায়ের জন্য চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে কমিশনের পরের বৈঠকে পেশ করা হবে।’
কলকাতার বুকে একাধিক প্রাচীন বাড়ি হেরিটেজ স্বীকৃতি দিয়ে কমিশনকে মামলার মুখে পড়তে হয়েছে। একই অবস্থা উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রেও। জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িকে কমিশন হেরিটেজ ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে যাঁরা রাজবাড়িতে বসবাস করছেন কমিশন তাঁদের সম্মতি নেয়নি। ফলে রাজবাড়ির সদস্যরা কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চে মামলা করেছে। অপরদিকে, রাজবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষাকারী সংগঠন পালটা মামলা করেছে। এই মামলার জল কোথায় গড়াবে কেউ জানে না।
একারণে উত্তরবঙ্গে শতাধিক বছরের প্রাচীন বাড়িকে হেরিটেজ ঘোষণার আগে সেই বাড়ির মালিকের সম্মতিপত্র জোগাড় না করে কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে না। আনন্দগোপালের কথায়, ‘১৫০ বছরের পুরোনো জলপাইগুড়ি ইউরোপিয়ান ক্লাব পরিচালনার ভার বর্তমানে জলপাইগুড়ি ক্লাবের হাতে। জলপাইগুড়ি ক্লাব ইতিমধ্যে কমিশনকে চিঠি দিয়ে হেরিটেজ স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে।’
হেরিটেজ কমিশনের আলোচনায় এধরনের একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে এসেছে। জলপাইগুড়ি শহরের বাবুপাড়ায় চা শিল্পপতি এপি রায়ের বাড়িতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা এসেছিলেন। নেতাজি স্বাধীনতা আন্দোলনের বৈঠকও করেন। জাতীয় ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবে হেরিটেজ কমিশন বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিতেই প্রোমোটারের থাবায় বাড়ি ভেঙে বহুতল নির্মাণ করা হয়।
অন্যদিকে, কোচবিহার শহরে ব্রাহ্মসমাজের নামে ৫ বিঘা জমি ছিল। কিন্তু স্থানীয় পুর ও জেলা প্রশাসনের অসহযোগিতায় সেই জমি ব্রাহ্মসমাজকে না ফিরিয়ে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে কোচবিহারের ক্ষেতি ফুলবাড়ির বসুনিয়াবাড়িতে ঘণ্টা বাজিয়ে দুই শতাধিক বছর ধরে প্রচুর মানুষ একসঙ্গে খেতে বসতেন। প্রয়াত প্রাক্তন মন্ত্রী দীনেশ ডাকুয়ার বাড়িতেও একইরকম ব্যবস্থা ছিল। এই দুই ঐতিহাসিক বাড়ি সংরক্ষণের জন্য নিজের অধীনে নিতে কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। মালদা জেলায় একাধিক সৌধ ভেঙে দুষ্কৃতীরা নিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেখার কেউ নেই।
