অনসূয়া চৌধুরী, জলপাইগুড়ি: বিজ্ঞাপনটা নজর কেড়েছিল। পুরোনো গাড়িটা বদলাতে বলায় বাবা হাসতে হাসতে মেয়েকে বলছেন, ‘টাকা কে দেবে? তোর বাবা?’ মেয়েও হাসতে হাসতে নতুন গাড়ির দামের চেকটা হাতে দিতেই বাবা চমকে ওঠেন, এত টাকা…? বাবাকে আশ্বস্ত করে মেয়ের জবাব, ‘রিল্যাক্স বাবা, জমিয়েছি।’ বাবার চোখে জল। বলেন, ‘মেয়েটা বড়ো হয়ে গেল।’
মেয়েকে নিয়ে ঠিক এতটাই গর্ব করতে পারেন ময়নাগুড়ি ব্লকের জাবরামালী এলাকার কীর্তনিয়া রবিন রায়। সংসার টানতে তিনি বছর কয়েক আগে একটি টোটো কিনেছিলেন। কিন্তু একটি হাত অসাড় হয়ে যাওয়ায় রবিন আর টোটো চালাতে পারেন না। স্ত্রী অসুস্থ স্বামীর দেখভাল করেন আর ঘরের কাজ সামলান। বাধ্য হয়ে ছেলে আর বড় মেয়ে পড়াশোনা ছেড়েছে। ছেলে কাজ নিয়েছে অসমে মোবাইল সারানোর একটি দোকানে। কোনওমতে নিজের খাবারটুকু জোগাড় করে নামমাত্র টাকা বাড়িতে পাঠায় সে।
সংসারের হাল দেখে বাবার টোটো নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল ১৬ বছরের ঋতু। দিনেরবেলা টোটো চালিয়ে আর রাতে পড়াশোনা করে এবারই মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে। ঋতু জানায়, সারাদিন টোটো চালিয়ে যা আয় হয় তাতে সংসারের দিনের খরচ চলে যায়। পড়াশোনাটাও করতে পারি।
প্রাপ্তবয়স্ক না হয়ে টোটোর স্টিয়ারিং হাতে নেওয়াটা বেআইনি। তবু ঋতুর এই লড়াইকে শনিবার কুর্নিশ জানাল জেলা পুলিশ ও প্রশাসন। এদিন আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হল পুলিশলাইনে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে ওই কিশোরী জানাল, ‘আমার পরিবারের সামর্থ্য নেই টিউশন দেওয়ার। তাই টিউশন ছাড়াই পরীক্ষায় বসেছিলাম। দিদিকেও মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে৷ বাবা টোটো চালাত কোনওমতে। অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই রাস্তাও বন্ধ হয়ে যায়। মেয়ে বলে কি টোটো চালাতে পারব না? কোনও কাজই ছোট নয়, এই ভেবেই পথে নেমে পড়েছি টোটো চালাতে৷’
মেয়েকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, এদিন তা দেখতে এসেছিলেন রবিন। তিনি বলেন, ‘ছোট মেয়ের রোজগারেই আমাদের মুখে অন্ন জুটছে। আমি অপারগ হয়ে গিয়েছি। একদিকে আমার চিকিৎসা, ওদের পড়াশোনা, আবার পেটের জ্বালা। এ এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি। মাঝেমধ্যে কীর্তনের ডাক পেয়ে ছুটে যাই৷ দু’পয়সা রোজগারের তাগিদে৷’
পুলিশের এই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন জেলা শাসক শামা পারভিন, পুলিশ সুপার খান্ডবাহালে উমেশ গণপত সহ পুলিশ ও প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকদের প্রায় সকলেই। তাঁদের সামনেই ঋতু জানাল, তার দুটো ইচ্ছা, থুড়ি স্বপ্নের কথা- এক, পড়াশোনা করে পুলিশে চাকরি করব। আর দুই, টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া দিদিকে আবার স্কুলে পাঠাব।
