জলপাইগুড়ি ব্যুরো: জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা চা বাগানের বিধ্বস্ত মডেল ভিলেজ থেকে ভেসে গিয়ে মৃতের সংখ্যা আরও চার বাড়ল। রবিবার পাঁচজনের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর সোমবার নতুন করে আরও চারজনের দেহ উদ্ধার হয়। সব মিলিয়ে এখানে বন্যা পরিস্থিতিতে নয়জন মারা গেলেন। এদিকে, মডেল ভিলেজ থেকেই আরও একজন নিখোঁজ হয়ে রয়েছেন। লুকসান থেকেও একজন নিখোঁজ। জলপাইগুড়ি জেলার আটটি ব্লকই কমবেশি বন্যা পরিস্থিতির শিকার। নাগরাকাটা ছাড়াও ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ক্রান্তি ব্লকগুলি দুর্যোগের শিকার হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্যার্তদের সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার বলে প্রশাসন সূত্রের খবর। গাঠিয়া নদীর তাণ্ডবে নাগরাকাটায় টন্ডু বস্তি, হাজিপাড়ার মতো একাধিক গ্রাম কার্যত ধ্বংসস্তূপের চেহারা নিয়েছে। ময়নাগুড়ির আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের তারারবাড়ি, খাটোরবাড়ি ও খড়িবাড়ি এলাকাতেও একই পরিস্থিতি। ক্রান্তি ব্লকের চ্যাংমারি চা বাগানের সাহেববাড়ি ও দোলাইগাঁওতে ৭৮টি পরিবার এখনও জলমগ্ন হয়ে আছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রশাসন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন নাগরাকাটার লুকসান লাগোয়া কালিখোলাতে রবিবার বামনডাঙ্গা থেকে উদ্ধার হওয়া মৃত ৫ জনের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের কর্মসূচিতে এসে জানান।
বামনডাঙ্গা চা বাগান থেকে এদিন নিবৃতি নায়েক (৬), মঞ্জু নায়েক (২৫), শকুন্তলা ওরাওঁ (৫০) ও এতোয়ারি ওরাওঁয়ের (৫৫) মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তাঁদের মধ্যে মঞ্জু ও নিবৃতি মা-মেয়ে। মডেল ভিলেজ লাগোয়া বিমলঝোরা থেকে দুজনের দেহ উদ্ধার হয়। বাকি দুজনের দেহ মডেল ভিলেজের পাশে ও বিছ লাইনে মেলে। মৃত মঞ্জুর ছেলে লিবিয়ান্স নায়েক (৪) এখনও নিখোঁজ। মডেল ভিলেজটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রাই জানাচ্ছেন। বামনডাঙ্গার আর্তদের প্রতি বহু মানুষ ও সমাজসেবী সংস্থা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বোটে করে গাঠিয়া নদী পেরিয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। মালবাজারের শিবহোম বালাজি ট্রাস্ট এদিন বোটে করে গাঠিয়া নদী পেরিয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়। মোট চারটি বোট সেখানে চালু করা হয়েছে। স্থানীয়দেরও নদী পেরিয়ে অন্যত্র যেতে বোটই ভরসা। বামনডাঙ্গা লাগোয়া ডায়না নদী দিয়ে বহু গবাদিপশুর দেহ এখনও ভেসে আসছে। মালবাজার পুরসভা এদিন বামনডাঙ্গায় জলের ট্যাংক পাঠায়। এদিকে, কুজি ডায়না নদীর জলোচ্ছ্বাসে আমিনা খাতুন নামে আরেক মহিলা লুকসান থেকে নিখোঁজ হয়ে রয়েছেন।
ময়নাগুড়ি ব্লকের অধিকাংশ স্থানেই জল নামতে শুরু করেছে। ১৬টি ত্রাণশিবির চালু রয়েছে। সোমবার সকাল থেকে ময়নাগুড়ির বিডিও প্রসেনজিৎ কুণ্ডু, জলপাইগুড়ির ডিএসপি ক্রাইম শান্তিনাথ পাঁজা, ময়নাগুড়ি থানার আইসি-র নেতৃত্বে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ বিলি শুরু হয়। একাধিক কমিউনিটি কিচেন চালু করা হয়। তবে আমগুড়ি এলাকায় জলঢাকার মূল বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। বেতগাড়া এলাকায় যেখানে রেল লাইনের নীচ থেকে মাটি ধসে গিয়েছিল, রেল তা মেরামত করেছে। এলাকায় একাধিক মেডিকেল টিম কাজ শুরু করেছে। পুলিশের তরফ থেকেও সহায়তাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে ত্রাণ নিয়ে আমগুড়ির কিছু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। সিভিক ভলান্টিয়াররা আমগুড়ি এলাকায় ভেঙে যাওয়া রাস্তা মেরামতের কাজ করছেন। রবি ও সোমবার বৃষ্টি না হওয়ায় ক্রান্তি ও ময়নাগুড়ি ব্লকের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অনেকটাই। তবে বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ কমেনি। ক্রান্তি ব্লকের চেংমারী গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেববাড়ি ও পশ্চিম দোলাইগাঁও গ্রামে এখনও ৭৮টি পরিবার জলমগ্ন হয়ে রয়েছে। পরিবারগুলি বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের তারারবাড়ি, খাটোরবাড়ি, খড়িবাড়ি এলাকায় প্রায় ৩০টির ওপর বাড়ি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক, বিদ্যুৎ এবং আবাসনমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের এদিন আমগুড়ির বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় তিনি আসতে পারেননি। প্রাণীসম্পদ কৃষি দপ্তর ও ব্লকের বিভিন্ন আধিকারিকরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করছে বলে ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কুমুদরঞ্জন রায় জানান। সেই রিপোর্ট তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্তদের যাতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পঞ্চানন রায়, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লক সভাপতি মহাদেব রায় সহ অন্যরা ক্রান্তির বিভিন্ন ত্রাণশিবির পরিদর্শনে যান। বৃষ্টি না হওয়ায় মেটেলি ব্লকের নেওড়া নদীর অনেকটাই জল কমেছে। তবে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদী সংলগ্ন এলাকার মানুষদের আতঙ্ক কাটেনি। নদীভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন। শনিবার প্রবল বৃষ্টির জেরে নেওড়া নদীতে প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়। বিধাননগর গ্রাম পঞ্চায়েতের নেওড়া মাঝিয়ালির বাটাইগোল বস্তি এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার নেয়। একটি বেসরকারি রিসর্টের সীমানা প্রাচীরের একাংশ ভাঙনের কবলে চলে গিয়েছে। ভাঙন জনবসতি এলাকার দিকে ধেয়ে আসছে। প্রশাসনিক আধিকারিক সহ জনপ্রতিনিধিরা রবিবার ওই এলাকা পরিদর্শন করেন। রবিবার রাতে নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে রাখার জন্য সংলগ্ন বাটাইগোল বস্তি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
তথ্য সহায়তা: শুভজিৎ দত্ত, শুভদীপ শর্মা, অভিরূপ দে, শুভাশিস বসাক ও কৌশিক দাস
