জলপাইগুড়ি ব্যুরো: গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) ডুয়ার্স (Dooars)। কোথাও সেতুর ডাইভারশন ভেঙে গিয়েছে, আবার কোথাও জলমগ্ন অবস্থায় ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বাসিন্দারা। গত বছর অক্টোবর মাসের প্লাবন পরিস্থিতি হতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন অনেকেই। এদিকে, গতকাল বৃষ্টি কিছুটা কম হওয়ায় মাল ব্লকের চাঁপাডাঙ্গা ও চ্যাংমারি এলাকায় জল কিছুটা কমেছে। তবুও প্রায় ২০০ পরিবার জলমগ্ন অবস্থায় ভুগছেন। সেঙপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জল জমে থাকায় সেখানকার পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
বৃষ্টিতে বানারহাট ব্লকে নোনাই নদীর উপর অস্থায়ী ডাইভারশনের একাংশ ভাঙতে শুরু করেছিল গতকাল থেকে। সোমবার তা বড়সড়ো আকার নেয়। সকাল থেকে চরম দুর্ভোগে পড়েন গয়েরকাটা থেকে দুরামারিগামী গাড়িচালক এবং নিত্যযাত্রীরা। দীর্ঘ সময় ধরে সেতুর দু’ধারে সারি সারি যানবাহন আটকে থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলামের অভিযোগ, ‘পূর্ত দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সময়মতো আসেনি। সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’ দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ও বাসিন্দারা নিজেরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছোট গাড়িগুলিকে পারাপারে সাহায্য করেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নোনাই নদীর এই সেতুর বেহাল অবস্থার কথা বারবার প্রশাসনের নজরে আনা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা এলেই এই সমস্যা নতুন করে সামনে আসে।
মাল ব্লকের চাঁপাডাঙ্গা ও চ্যাংমারি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বেশ কিছু জায়গা থেকে জল নামতে শুরু করলেও এখনও দুই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় ২০০টি পরিবার জলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি চ্যাংমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেববাড়ি ও দোলাইগাঁও এলাকায়। সেখানে প্রায় ৮২টি পরিবার এখনও বন্যার জলের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে জল ঢুকে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাঁধের উপর অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের গ্রাম জলমগ্ন। ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাঁধের উপরেই থাকতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এত দিন কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত এলাকায় কোনও ত্রাণ পৌঁছায়নি। ফলে খাবার ও পানীয় জলের সমস্যায় পড়েছেন অনেক পরিবার।
চাঁপাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের মাস্টারপাড়া, কেরানিপাড়া, সেনপাড়া সহ একাধিক এলাকাও এখনও জলমগ্ন। যদিও এখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশকে বাঁধে আশ্রয় নিতে হয়নি, তবুও জলবন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। বাড়ির চারপাশে জল জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত তাঁদের কাছেও কোনও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। বানভাসি বাসিন্দা রতন রায়, শিবেন রায় প্রমুখ বলছেন, প্রশাসনের তরফে দ্রুত সাহায্য না পেলে সমস্যা আরও বাড়বে।
চ্যাংমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান আবদুল সামাদ জানান, জলবন্দি পরিবারগুলির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। মালবাজারের মহকুমা শাসক উৎকর্ষ খাণ্ডাল জানান, প্লাবন পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সেঙপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জল জমে থাকায় গত চারদিন ধরে মিড-ডে মিল খাওয়ানো যায়নি পড়ুয়াদের। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপন সরকার বলেন, সোমবারও জল জমে রয়েছে। স্কুলে পঠনপাঠন বন্ধ। মিড-ডে মিল রান্না করাও যাচ্ছে না।
একই অবস্থা ধূপগুড়ি ব্লকেও। বারোঘরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার দামবাড়ি সহ আশপাশের এলাকায় জলবন্দি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে রবিবার রাতে তুলনায় বৃষ্টি কম হওয়ায় বাড়িঘরে নতুন করে জল ওঠেনি। অনেকের ধারণা, জলঢাকা নদীর বাঁধে ফাটল ধরে গ্রামে জল ঢুকছে। তবে সেচ দপ্তরের কোনও কর্তা বাঁধের ফাটল নিয়ে কিছু বলতে চাননি। গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের হোগলাপাতা, কুল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দারাও আতঙ্কে রয়েছেন। গত বছর ৫ অক্টোবর জলঢাকা নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম তছনছ হয়ে যায়। বর্তমানে বাঁধের নির্মাণকাজ চললেও ভারী বৃষ্টিপাতে জলস্ফীতি ঘটায় তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। বাঁধ নির্মাণের কিছু সামগ্রীও জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। সোমবার ওই এলাকায় ঘুরে দেখেন ধূপগুড়ির মহকুমা শাসক শ্রদ্ধা সুব্বা। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি আপাতত ঠিকই রয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বাঁধ মেরামতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।’

