নীহাররঞ্জন ঘোষ, মাদারিহাট: মাদারিহাটের রতন দাস পেশায় জলদাপাড়ার গাইড (Jaldapara)। পর্যটকদের নিয়ে প্রতি ট্রিপে তাঁর উপার্জন হয় ৩৫০ টাকা। কোনও কোনওদিন দুটো ট্রিপও হয়ে যায়। সেদিন রোজগার ৭০০ টাকা। ৫ অক্টোবর থেকে গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে এই রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। সংসার চলবে কী করে?
কেবল রতনের মতো গাইডরাই নয়, জলদাপাড়ার জিপসিচালক থেকে শুরু করে এলাকার ছোট-বড় গাড়িচালকরা, এমনকি সেখানকার হোটেল-রিসর্টের মালিক ও দোকানদাররাও চরম সমস্যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকে জলদাপাড়ার মূল গেট দিয়ে পর্যটকদের প্রবেশ সেই যে বন্ধ হয়েছে, এখনও চালু হয়নি। ফলে কয়েকশো লোকের রুটিরুজি বন্ধ। তাই শুক্রবার বিক্ষোভ দেখান এলাকার পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত লোকজন। তাঁরা জলদাপাড়ায় কার সাফারি ও এলিফ্যান্ট রাইড শুরু করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। রবিবারের মধ্যে তা শুরু না হলে, সোমবার থেকে তাঁরা জলদাপাড়া ঢোকার মূল গেটে ধর্নায় বসবেন।
শুক্রবার এই সংক্রান্ত একটি চিঠি জলদাপাড়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে বিভাগীয় বনাধিকারিককে দেওয়া হয়েছে। সেই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অনিরুদ্ধ দাসের হুঁশিয়ারি, রবিবারের মধ্যে সাফারি চালু না হলে যে আন্দোলন হবে তার দায় বন দপ্তরকে নিতে হবে।
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের সহকারী বন্যপ্রাণ সংরক্ষক নবিকান্ত ঝা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, ২-৩ দিনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের সাঁকো মেরামতের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কাঠের সাঁকো বলেই সংস্কারে সময় লাগছে। নবিকান্ত বলেন, ‘আমরা ৫০ ফুট বিটের কাছে থাকা কাঠের সাঁকো গত ৭ অক্টোবর থেকেই মেরামতের কাজ শুরু করেছি।’
বনাধিকারিকের আশ্বাস সত্ত্বেও পর্যটন ব্যবসায়ীরা মানতে নারাজ। তাঁদেরই একজন সঞ্জয় দাসের অভিযোগ, বন দপ্তরের ঢিলেমির জন্য এখনও চালু হচ্ছে না সাফারি। একই অভিযোগ জানিয়েছেন স্বপ্না ভট্টাচার্য, উত্তম শর্মা, কল্যাণ গোপ, গোপাল সন্ন্যাসী, বিকাশ সাহা, বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যরা। সকলেই ধর্নায় বসার হুমকি দিয়েছেন।
জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট গাইড ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কল্যাণ গোপ জানালেন, গাইডদের তো বিকল্প রোজগারের পথ নেই। তাঁদের দুর্দশা চরমে। এছাড়া মাদারিহাট থেকে জলদাপাড়া ভ্রমণের ২৬টি জিপসি রয়েছে। সাফারির প্রতি ট্রিপে চালকরা ১৪৫০ টাকা করে নেন। অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে রোজগার হয় ৬০০-৭০০ টাকা। এই টাকায় তাদের সংসার চালাতে হয়। এখন সব বন্ধ। জানালেন, জিপসি ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি গোপাল সন্ন্যাসী।
মাদারিহাট ট্যাক্সি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস জানালেন, ৭০-৮০টি ছোট গাড়ি সরাসরি পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন প্রায় ১০০০ টাকা করে ক্ষতি হচ্ছে।
এমন ক্ষতির কথা ঘরে ঘরে। মাদারিহাটের মুরগির মাংস বিক্রেতা তাপস সাহা বলছিলেন, প্রতিদিন মাদারিহাটের সব লজ মিলে প্রায় ১০০ কিলোগ্রাম মাংস বিক্রি হত। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টাকার মাংস বিক্রি হত। এখন এই বিক্রি বন্ধ। একই সমস্যার কথা জানালেন মাছ বিক্রেতা রাজকুমার মাহাতো, পবন শা, বিপ্লব বর্মনরা।
মাদারিহাটে ট্যুর অপারেটর রয়েছেন ৭ জন। তাঁদের মধ্যে অনিরুদ্ধ দাস, উত্তম শর্মা জানালেন, প্রতিটি লজে ৮০-৯০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে গিয়েছে। মাদারিহাটের রিসর্ট মালিক সঞ্জয় দাস, কৌশিক রায়দের দাবি, কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না তাঁরা।
