রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার: ফের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হল এই বঙ্গে। কলকাতায় ছয় বছর আগে বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে এই মনীষীর মূর্তি ভাঙা নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। এবার বর্ণপরিচয় স্রষ্টার মূর্তিতে আঘাত হানার ঘটনা ঘটল উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারে। শুক্রবার দুপুরে স্থানীয়দের নজরে আসে, ইটাহার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে রাস্তার বাঁকে বসানো কংক্রিট নির্মিত বিদ্যাসাগরের আবক্ষমূর্তির চিবুকের একটি অংশ ভাঙা। মুখমণ্ডলেও একাধিক ফাটল। বিষয়টি জানাজানি হতেই শোরগোল পড়ে যায় ইটাহারে। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় তোলেন। ঘটনাটি পুলিশের নজরেও আনা হয়। প্রশ্ন উঠছে, কে বা কারা এই জঘন্য কাণ্ড ঘটাল? কোনও অসৎ উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্র করে এই মূর্তি ভাঙা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বিদ্যাসাগরের এই অবমাননার বিরুদ্ধে শনিবার প্রতিবাদ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ-র উত্তর দিনাজপুর জেলা কমিটি। ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছে ইটাহারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মহল। প্রাথমিকভাবে পুলিশের অনুমান, কোনও দুষ্ট প্রকৃতির ব্যক্তি বা মদ্যপ কেউ এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, মূর্তির ভাঙা অংশ মেরামতির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যে বা যারা এই দুষ্কর্ম ঘটিয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইটাহার অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের কার্যালয়ের সংযোগস্থলে ২০০৬ সালে ইটাহার হাইস্কুলের প্রয়াত শিক্ষক প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কংক্রিট নির্মিত একটি আবক্ষমূর্তি বসানো হয়। মূর্তি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে একপাশে বিডিও অফিস, একপাশে পঞ্চায়েত কার্যালয় ও সামনে ইটাহার উচ্চবিদ্যালয়। চারপাশ সিসিটিভি ক্যামেরায় মোড়া। এমন একটি স্থানে রাতের অন্ধকারে কে বা কারা এসে এই মনীষীর মূর্তি ভাঙার সাহস পেল, তা ভেবেই হতবাক হচ্ছেন সকলে। ইটাহার মূর্তি সংস্থাপন কমিটির আহ্বায়ক অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই। আমরা শুধু বলব ছিঃ! বিষয়টি মৌখিকভাবে ইটাহার থানার আইসিকে জানানো হয়েছে। লিখিতভাবেও অভিযোগ জানানো হবে। কারণ, দুষ্কৃতীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হবে।’
ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন স্থানীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের অনেকেই। ইটাহার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক মুক্তিরঞ্জন থোকদার বলেন, ‘রোজ স্কুলে ঢোকার সময় আমরা ও ছাত্রছাত্রীরা বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি দর্শন করি। আজ স্কুল ছুটি ছিল। মূর্তি ভাঙার খবর পেয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। এটা মানা যায় না। সম্ভবত পরিকল্পিতভাবে কেউ এই কাজ করেছে। শনিবার স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে ওই মূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়ে ধিক্কার জানাব।’
পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির উত্তর দিনাজপুর জেলা কমিটির সহ সভাপতি সাহেরুল হকের প্রতিক্রিয়া, ‘যে মনীষীর বর্ণপরিচয় পড়ে আমাদের অক্ষরজ্ঞান হয়, তাঁর মূর্তির উপরে এই আঘাত কিছুতেই মানা যায় না। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আমাদের বাঙালির ভাবাবেগ জড়িয়ে আছে। অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা। এই ঘটনা যে বা যারাই করুক, তাদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক যাতে ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটানোর কেউ সাহস না পায়।’
বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘও। সংঘের ইটাহার শাখা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আহমেদ হোসেন ও সন্দীপকুমার ঝা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এটা আমাদের লজ্জা। কে বা কারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাল তা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করার দাবি জানাচ্ছি। এই কুৎসিত ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার আমরা মূর্তির পাদদেশে সংঘবদ্ধ হয়ে ধিক্কার মিছিল করব। থানায় গিয়ে পুলিশের কাছেও লিখিতভাবে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানানো হবে।
