অরুণ ঝা, ইসলামপুর: ইসলামপুর (Islampur) গ্রাম পঞ্চায়েতের তেলিভিটায় রাস্তার দু’পাশে থোকা থোকা গাঁদা ফুলের গাছের সারি যে কারও মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে দেখে বোঝার উপায় নেই, রাস্তাটি মাটির না পিচের। মাফিয়াদের দাপটে দলঞ্চা নদীর বুক খালি করে এই পথে অবাধে পাচার হচ্ছে ট্রলি ট্রলি মাটি। যার জেরে রাস্তার দফারফা।
প্রসঙ্গটি নিয়ে পথচলতি লোকের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বছর পঁয়ষট্টির মহম্মদ ইসমাইলের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, ‘ফুলের গাছকে অযত্নে রাখা হলে সাজানো বাগান নষ্ট হতে সময় লাগবে না।’ তারপরেই বললেন মূল কথাটি, ‘টিকিট নিয়ে তৃণমূলের (TMC) কাজিয়া ঠান্ডা না হলে মজা লুটবে বিজেপি।’
ইসলামপুরে এবার প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে ত্রিমুখী কাজিয়া। বিজেপির মোকাবিলার চেয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জ এই গোষ্ঠী বিবাদ। টানা ১১ বারের বিধায়ক আবদুল করিম চৌধুরীও চ্যালেঞ্জের মুখে। ইসলামপুর আসনে করিমেরই টিকিট প্রাপ্য বলে তাঁর অনুগামীরা আওয়াজ তুলতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে, দলের উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়ালই প্রার্থী হবেন বলে তাঁর অনুগামীদের প্রচারেও খুূব উৎসাহ।
করিম-কানাইয়া সংঘাত ইসলামপুরের রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু এবার দলের ইসলামপুর ব্লক সভাপতি জাকির হুসেনও প্রার্থী হতে চেয়ে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করায় দ্বন্দ্ব ত্রিমুখী চেহারা নিচ্ছে। করিমের সঙ্গে জাকিরের সম্পর্ক কখনও মধুর ছিল না। কিন্তু কানাইয়ার ভোট ম্যানেজার বলে পরিচিতি ছিল জাকিরের। সেই কানাইয়াকে টপকে জাকির প্রার্থী হতে চাওয়ার দলে কাজিয়া এখন চরমে।
ব্লক সভাপতি হওয়ায় ইসলামপুরে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ জাকিরের হাতে। জাকির অনুগামীরা ‘হয় এবার, নয় নেভার’ বলে অনড় অবস্থান নিয়ে আছেন। তৃণমূলের অন্দরের রাজনীতিতে এই তোলপাড়ে ইসলামপুর আসন ধরে রাখা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। চর্চা চললেও তৃণমূলের এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে হেলদোল নেই ইসলামপুর বিধানসভা এলাকার ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েতের আমজনতার।
তাঁরা অনেক বেশি বিরক্ত অনুন্নয়ন ও শাসকের মদতে মাফিয়াগিরির জন্য। রামগঞ্জ-১ অঞ্চলের মহম্মদ মেহবুব বলছিলেন, ‘এই রামগঞ্জ বাজারের নিকাশিনালা ও রাস্তার বেহাল অবস্থা দেখছেন তো। উন্নয়ন নিয়ে কারও হেলদোল আছে বলে মনে হয়?’ পেশায় ওই স্কুল শিক্ষকের উষ্মা, ‘আমিও তৃণমূল করি। কিন্তু আমাদের এলাকায় বিধায়ক তহবিলের বরাদ্দে যে কোনও কাজই হয়নি, তা গোপন করি কীভাবে!’
রামগঞ্জ-২ অঞ্চলের ধুররা, উড়িয়াটোল, নিরাপদনগর কলোনি সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সার্বিক অনুন্নয়নের ছবিটা একইরকম। পানীয় জল থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটের দুর্দশা নিয়ে বাসিন্দাদের ক্ষোভের অন্ত নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল নেতা সমস্যাটি মানলেন, ‘টিকিটের জটিলতা নিয়ে আমরা দ্বন্দ্বে আছি। ভোটাররা কিন্তু কাজ ও কাজের মানুষ চাইছেন।’
ভদ্রকালীকে পিছনে রেখে মাটিকুন্ডা বাজারে পৌঁছে চায়ের দোকানে আলাপচারিতা কানে এল, ‘মোক রাজনীতি বুঝবা আসবোনি। ইমারলার খাবলাখাবলি মোদিক ফায়দা করি দিবে। বুঝা পালো।’ মাটিকুন্ডা-১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে বটে, তবে বিজেপির (BJP) ভোটব্যাংকও খারাপ নয়। সেকারণেই তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বে গেরুয়া শিবিরে খুশির আভাস। কোথাও কোথাও কোমড় কষে এর সুযোগ নিতে চেষ্টা চলছে।
গুঞ্জরিয়া অঞ্চলের বিবেকানন্দ কলোনির জীবন অধিকারী খোলাখুলি বললেন, ‘দিদির উন্নয়নের লাভ আমরা পেয়েছি ঠিকই। কিন্তু স্থানীয় নেতৃত্ব মিলেমিশে না থাকলে বিরোধীরা ফসল ঘরে তুলবে।’ গাইসাল-১ ও ২ অঞ্চলেও টিকিটের সমীকরণের উপর ইসলামপুরে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। পণ্ডিতপোঁতা-১ ও ২ গ্রাম পঞ্চয়েত এলাকায় আবার ভোটের মেরুকরণের মেজাজ গোপন করছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।
ইসলামপুর পুরসভা তৃণমূলের দখলে থাকলেও লোকসভা, বিধানসভা নির্বাচনে লিড নেওয়ার রেকর্ড বিজেপির ঝুলিতেই। ইসলামপুর শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দলঞ্চা নদীর পাড়ে মাচায় বসে সত্তর ছুঁইছুঁই এক্রামুল হক বললেন, ‘গ্রাম্য ভাষায় চুঙাবান বোঝেন? যে বান বা বাঁধনে নড়াচড়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। প্রার্থী নিয়ে দলের নেতাদের কাজিয়া শান্ত না হলে চুঙাবানে পড়বে তৃণমূল।’
মাটি মাফিয়াদের দাপটে কার্যত অস্তিত্ব সংকটে থাকা দলঞ্চা নদী। বাইকে স্টার্ট দিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী সুরেশ সিংহ বলে গেলেন, ‘কী মনে করছেন- নেতারা এসব জানেন না? বখরা সময়মতো পৌঁছে যায়। ফলে কারও হেলদোল নেই।’
