জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা: প্রায় ২২ বছর পর ইদে বাকের খানের চোখে সুরমার প্রলেপ পরবে। ছেলেমেয়েদের পিড়াপিড়িতে ইদের বাজার করতে এসে সুদৃশ্য সুরমাদানি সহ মরক্কোর সুরমা কিনেছেন (Islamic Custom Surma)। তাঁর কথায়, ‘ছোটবেলায় কাঠিতে তুলো লাগিয়ে ঠাকুমা সুন্দর করে লাগিয়ে দিতেন। সুরমা না লাগালে ইদগাহ ময়দানে যেতাম না। কিন্তু ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর বাড়িতে ওই কায়দায় চোখে সুরমার প্রলেপ দেওয়ার আর কেউ ছিল না।’ এখন রুল পেনসিলের মতো সুরমাদানি পাওয়া যাচ্ছে। সেটা দেখেই তাঁর ছেলেমেয়েরা সুরমা কিনতে আগ্রহ দেখায়।
সুরমা আসলে একধরনের খনিজ উপাদান। একটি বিশেষ প্রাকৃতিক খনিজ পাথর থেকে সুরমা তৈরি হয়। নবীর সুন্নত পালনে চোখে সুরমা লাগানো হয়ে থাকে। সারাবছরই সুরমা লাগানো যায়, তবে ভারতবর্ষে ইদে চোখের পাতায় সুরমার প্রলেপ দিয়ে ইদগাহ প্রাঙ্গণে যাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সুরমার উৎপাদন মূলত হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে। মরক্কো, ইসফাহান, লেভান্টের সুরমা জগৎবিখ্যাত। ভারতবর্ষে আমদানি করা এই সুরমার বাজার মূলত রয়েছে হায়দরাবাদ, মুম্বই, দিল্লি ও বেরিলিতে। সুরমা কারবারিরা এই চারটি কেন্দ্র থেকে নিয়ে এসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা করেন।
ইদে সুরমার আলাদা বাজার রয়েছে। মালদা শহরে মূলত আতরের সঙ্গেই সুরমা বিক্রি হয়ে থাকে। শহরের ইদের বাজার বলতে মূলত বিএস রোড, চিত্তরঞ্জন মার্কেটকেই বোঝায়। এই এলাকায় একাধিক দোকানে আতরের সঙ্গেই সুরমা বিক্রি হয়। নজরুল ইসলাম নামে এক সুরমা ব্যবসায়ী জানান, সুরমার দাম খুব বেশি নয়। ৫০-২০০ টাকার মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আবহের জন্য সুরমার পর্যাপ্ত জোগান ভারতবর্ষে রয়েছে কি না এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একবার সুরমা কিনলে প্রতি বাড়িতে কমবেশি দুই-তিন বছর চলে যায়। ভারতের সুরমা কারবারিদের কাছে যা মজুত রয়েছে তাতে আগামী ৫ বছর আমদানি না করলেও চলবে।’ তাঁরা অবশ্য কলকাতার সুরমা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ে থাকেন। সুরমার সঙ্গে এখন বিভিন্ন ডিজাইনের সুরমা দানি এসেছে। তাতে পেনসিলের বা আইলাইনারের মতো সুরমার প্রলেপ দেওয়া যায়। ছেলেমেয়েদের এই সুরমাদানির প্রতি আগ্রহ বেশি, বিক্রিও হচ্ছে যথেচ্ছ বলে জানান তিনি।
শহরের চিত্তরঞ্জন মার্কেটের পাশাপাশি মুসলিম মহল্লাগুলিতেও ইদের ছোটখাটো বাজার বসেছে। আতর, টুপির সঙ্গে সেখানেও বিক্রি হচ্ছে সুরমা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মীরচক, পিঁয়াজি মোড় এলাকা। পিঁয়াজি মোড়ে স্থানীয় আবুল বাসারের চোখে সুরমা লাগিয়ে দিচ্ছিলেন দোকানি আনিসুর রহমান। বাসার বলেন, ‘ইসমিদ সুরমা খুব সহজে পাওয়া যায় না। এই দোকানে দেখতে পেয়ে দুই শিশি কিনলাম। এই বিশেষ সুরমা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতবর্ষে আসে। আমাদের নবী এই সুরমা চোখে লাগাতেন।’
মালদার বিবিগ্রাম জামে বড় মসজিদের ইমাম মৌলানা ওসমান গণি বলেন, ‘সুরমার গুণাগুণ অনেক বেশি। যাঁরা নিয়মিত চোখে সুরমা লাগান তাঁদের দৃষ্টিশক্তি বাড়ে। চোখের পাপড়ি ও ভ্রূ গজাতেও সাহায্য করে। প্রাকৃতিকভাবে চোখের সুরক্ষা বাড়ায়। এই সুরমা শুধুই প্রসাধনী নয়, চোখে সুরমা লাগানো আমাদের নবীর সুন্নত।’ চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিক থেকেও চিকিৎসকরা এই প্রাকৃতিক উপাদান লাগানোয় কোনও ক্ষতি নেই বলে জানাচ্ছেন। মালদা রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ সুমন লোধ বলেন, ‘সুরমা কেনার আগে অবশ্যই ভালো মানের রয়েছে কি না তা যাচাই করে নেওয়া দরকার। তাতে কোনও রাসায়নিক রয়েছে কি না সেটা দেখে নেওয়া দরকার।’ সুরমা মূলত প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়। তবে লাগানোর সময় মনে রাখতে হবে সুরমা যাতে কোনওভাবে চোখের ভিতরে না চলে যায়। তাহলে ক্ষতি হবে। চোখের পাতায় লাগালে কোনও অসুবিধা নেই বলে তিনি জানান।
