উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: রাজ্যের দুর্গাপুজোর পাস বিক্রিকে (Durga Puja move rip-off) কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে নাম জড়ানোর পর অবশেষে ইডির ম্যারাথন জেরার মুখে পড়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন (Indranil Sen)। দীর্ঘ চার ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষে তাঁকে গতকাল পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং আজ তাঁকে কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হলে বিচারক আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর পুলিশি হেপাজত মঞ্জুর করেছেন। তদন্তের গভীরে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে শুনানির সময় পুলিশ অভিযুক্তকে নিজেদের হেপাজতে নিতে ১২ দিনের আবেদন জানালে, উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাবে ইডির (ED) তদন্তের নানান দিক, কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন এবং বেশ কিছু সন্দেহজনক কর্পোরেট সংস্থার যোগসূত্র আদালতের সামনে উন্মোচিত হয়।
তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে যে, ২০২১-২২ সালের সময়কালে ‘মাস আর্ট’ নামক একটি নির্দিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে সংঘটিত আর্থিক লেনদেনগুলি বর্তমানে তাদের বিশেষ নজরে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ওই সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিরাট অংকের অর্থ সরাসরি প্রাক্তন মন্ত্রীর স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এই হাতবদলের নেপথ্যে ইন্দ্রনীল সেনের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা বা যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতেই তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জেরা করা আবশ্যিক বলে আদালতকে জানানো হয়।
অন্যদিকে, শুনানিকালে সরকারি আইনজীবী তীব্র আপত্তি জানিয়ে দাবি করেন যে, যে ২৪টি পুজো কমিটিকে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর কোনো দাপ্তরিক সম্পর্ক ছিল না। যদিও এই সংক্রান্ত চুক্তিপত্র ২০২৫ সালের দিকে সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও, রহস্যজনকভাবে ২০২২ সালের আর্থিক লেনদেনের তথ্য ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বেআইনিভাবে ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহার করা হয়েছে এবং টাকা পরিশোধ করার পরেও বহু মানুষ প্রতিশ্রুত পুজোর পাস পাননি বলে অভিযোগ করেছে সরকারি পক্ষ। এই পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় জামিন পেলে তিনি তদন্তের গতিপ্রকৃতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। আদালতে নিজের সপক্ষে তিনি জানান যে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং পুলিশ প্রশাসন যখনই তাঁকে তলব করেছে, তিনি সবসময় পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন এবং কোনো লুকোচুরি না করে ইডি দপ্তরে হাজিরা দিয়েছেন। ‘মাস আর্ট’ ছাড়াও ‘থার্ড আই’ নামের অপর একটি সংস্থার সঙ্গে তাঁর নাম জড়ানোর প্রসঙ্গে ইন্দ্রনীল সাফ জানিয়েছেন যে, ওই সংস্থাগুলির নির্দিষ্ট কিছু পদে তাঁর স্ত্রী বা অন্য ব্যক্তিরা যুক্ত থাকতে পারেন, তবে তিনি নিজে কোনোকালেই ওই সংস্থাগুলির কোনো সদস্য, প্রেসিডেন্ট কিংবা ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট পদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট বা পাসের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভিন্ন এজেন্সির ওপর ন্যস্ত ছিল এবং সংশ্লিষ্ট মামলার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তরা ইতিমধ্যে আদালত থেকে জামিন পেয়ে গেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থার হাতে কোনো সুনির্দিষ্ট ও পোক্ত প্রমাণ নেই দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ব্যক্তিগত কারণে এই মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে যখন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে নতুন করে বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করে এমন তড়িঘড়ি গ্রেপ্তারি বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রকৃত যৌক্তিকতা কী ছিল।
সরকারি কৌঁসুলিরা অবশ্য এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আদালতকে জানান যে, ঘটনার সময় ইন্দ্রনীল সেন রাজ্যের একজন ক্ষমতাশালী মন্ত্রী ছিলেন এবং তৎকালীন টেন্ডার বা দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। অভিযুক্ত যতই নিজেকে এই দুর্নীতির চক্রব্যূহ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন না কেন, এই কেলেঙ্কারির একেবারে মূল শিকড় ও সত্য পর্যন্ত পৌঁছাতে তাঁকে পুলিশি হেপাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সমস্ত সওয়াল ও প্রামাণ্য দলিল খতিয়ে দেখার পর ব্যাঙ্কশাল আদালতের বিচারক প্রাক্তন মন্ত্রীকে আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেপাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

