অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার: কয়েক দশকের বঞ্চনা কাটিয়ে ব্রহ্মপুত্র বোর্ডে জায়গা পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তবু ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন (Indo-Bhutan River Fee) নিয়ে ধোঁয়াশা কাটল না। এতদিন আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ এখন বোর্ডের স্থায়ী সদস্য। এর জেরে বন্যা নিয়ন্ত্রণে যে বিপুল পরিমাণ অর্থবরাদ্দ করে বোর্ড, তার সুবিধা পেতে চলেছে রাজ্য। তবে দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ হলেও উত্তরবঙ্গের জন্য ইন্দো-ভুটান নদী কমিশনের দাবি এখনও পূরণ হল না।
এর আগে তৃণমূল পরিচালিত রাজ্য সরকার বিধানসভায় ওই কমিশন তৈরির প্রস্তাব করে তা কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিল। তবে সবুজ সংকেত মেলেনি। বর্তমানে রাজ্যে বিজেপি আসার পর কেন্দ্রীয় সরকার কি নদী কমিশন তৈরিতে জোর দেবে? সেই প্রশ্নই জোরদার হচ্ছে। এদিকে নদী কমিশন না হলে উত্তরবঙ্গ খুব একটা লাভ পাবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়া নেতাদের মধ্যে অন্যতম আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল। তিনি বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র বোর্ডে স্থায়ী জায়গার দাবি পূরণ হয়েছে। তবে ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন না হলে সঠিক বরাদ্দ পাওয়া যাবে না। কমিশন তৈরি হলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে।’ সুমনের যুক্তি, ব্রহ্মপুত্র বোর্ড নির্দিষ্ট রিপোর্ট দেখে জলশক্তিমন্ত্রকের মাধ্যমে অর্থবরাদ্দ করে। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে এই রিপোর্ট দেবে সেচ দপ্তর। তবে সেচ দপ্তরের হাতে এত পরিকাঠামো নেই যে সঠিক পর্যালোচনা করতে পারবে। নদী কমিশন হলে সেচ দপ্তরের আধিকারিকরা ছাড়াও ভারত ও ভুটানের বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হবেন। তাঁরা সঠিক রিপোর্ট দিতে পারবেন।
আবার এই দাবি নিয়ে সরব হওয়া আলিপুরদুয়ারের আরেক প্রাক্তন বিধায়ক দেবপ্রসাদ রায় অন্য আশঙ্কা করছেন। তাঁর মতে, ‘এতদিন ব্রহ্মপুত্র বোর্ডে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে আমন্ত্রিত হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ থাকায় ওই বোর্ড থেকে যে অর্থবরাদ্দ হত, তার শতকরা ভাগ ছিল বেশি। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ টাকা কেন্দ্র দিত এবং বাকি ২৫ শতাংশ টাকা রাজ্যকে দিতে হত। অন্য রাজ্যের ক্ষেত্রে সেই বিভাজন ৯০ ও ১০ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে রাজ্য এতদিন বেশি টাকা দিতে না পারায় কেন্দ্রের টাকাও ফেরত যেত। এবার স্থায়ী সদস্য হওয়ার পর আদৌ ৯০-১০ শতাংশের বিভাজন রাজ্যে কার্যকরী হবে কি না, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।’ অন্যদিকে তিনি জানাচ্ছেন, ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন অবশ্যই দরকার তবে ব্রহ্মপুত্র বোর্ড থেকে টাকা পেতে গেলে তা বাধ্যতামূলক নয়।
ভুটান থেকে প্রায় ৭৬টি নদী উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করেছে। প্রধান যে নদীগুলি ডুয়ার্সে প্রবেশ করেছে, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য তোর্ষা (আম-চু), জলঢাকা, রায়ডাক (ওয়াং-চু), সংকোশ, ডুডুয়া, গিলান্ডি, মুজনাই, বিরকিটি এবং শিসামারা। নদীগুলি ডুয়ার্স অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বা ব্রহ্মপুত্রে মেশে। ভুটানে অবাধ ডলোমাইট মাইনিং, নদীর পাড়ে তা জমিয়ে রাখা, যেখানে-সেখানে বাঁধ নির্মাণ, এছাড়া পাহাড়-জঙ্গল যথেচ্ছভাবে কাটা পড়ায় নদীগুলির চরিত্র বদল হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বর্তমানে সব থেকে বড় ভয় হড়পার। এই পরিস্থিতিতে নজরদারি দরকার। বর্তমানে একটি ‘জয়েন্ট টিম অফ টেকনিকাল এক্সপার্ট’ থাকলেও পুরোপুরি কমিশন চাইছেন অনেকে। এই নিয়ে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র বোর্ডে রাজ্যের স্থায়ী জায়গা পাওয়াই বলে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের জন্য ভাবছে। আরও যা দাবি রয়েছে তাও পূরণ করা হবে বলেই আশা রাখছি।’
