উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার (India-Australia deal) দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। মেলবোর্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের মধ্যে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পরমাণু শক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার একাধিক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে ইউরেনিয়াম রপ্তানির পথ সুগম হলো, যা ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কর্মসূচিতে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরমাণু শক্তির এই চুক্তির পাশাপাশি ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (ইন্দো-প্যাসিফিক) (Indo-Pacific) চিনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য রুখতে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই সফর কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লাদাখ সংঘাতের পর থেকে ভারত ও চননের সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ‘কোয়াড’ (QUAD) গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে। গত মাসে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে ‘জয়েন্ট মেরিটাইম সিকিউরিটি কোলাবরেশন রোডম্যাপ’ চূড়ান্ত হওয়া এবং ভারত মহাসাগরে নৌ-মহড়ায় অস্ট্রেলিয়ার অংশগ্রহণ—চিনকে এক কড়া বার্তা দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ববাণিজ্যের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামুদ্রিক পথ দিয়ে। এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চিনের সামরিকীকরণের প্রবণতা এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সাগরে তাদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক দাবি নিয়ে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া উভয় দেশই উদ্বিগ্ন। চিনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের মাধ্যমে জিবুতি থেকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা হয়ে পাকিস্তানের গ্বদর বন্দর পর্যন্ত যে সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, তা ভারত ও অস্ট্রেলিয়া—উভয়ের জন্যই মাথাব্যথার কারণ। চিনের ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর’ ও অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতকে কার্যত ঘিরে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, তার পাল্টা কৌশল হিসেবেই ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি তোলার পর থেকেই বেজিং ও ক্যানবেরার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যার প্রভাব পড়ে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও। বর্তমান পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া ভারতের জন্য কেবল একটি বাণিজ্যিক সহযোগী নয়, বরং এশীয় অঞ্চলে চিনের আগ্রাসন রুখতে এক অজেয় সামরিক মিত্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করছে। এই নতুন চুক্তি ও কৌশলগত সমন্বয় ভারতকে দীর্ঘমেয়াদে পরমাণু শক্তি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করে তুলবে বলেই মত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের।

