উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ রাজনীতির দাবায় কে যে কখন কার ঘুঁটি হয়, তা বোঝা সত্যিই দায়! তবে এবার যা ঘটছে, তাকে ‘নাটক’ বললেও কম বলা হয়। একদিকে সীমান্তে বারুদের গন্ধ, অন্যদিকে পাকিস্তানের পঞ্জাবের মাঠে চলছে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ মহড়া। নাম তার— ‘ইনস্পায়ার্ড গ্যামবিট ২০২৬’। পাত্র-পাত্রী কারা? স্বয়ং আমেরিকা এবং সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত পাকিস্তান! ভাবা যায়? যে দেশটাকে সারা বিশ্ব চেনে জেহাদিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে, তাদেরই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সন্ত্রাস দমনের কৌশল শিখছে সুপারপাওয়ার আমেরিকা! একেই কি বলে ভূ-রাজনীতির সেরা জোক?
পঞ্জাব প্রদেশের ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারে চলছে এই দুই সপ্তাহের যৌথ মহড়া। উদ্দেশ্য নাকি শহুরে সন্ত্রাস দমন এবং দুই দেশের সেনার মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানো। শুনতে বেশ গালভরা! কিন্তু বাস্তবের মাটিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে অন্য গল্প। ঠিক যে সময় এই ‘মহড়া’ চলছে, সেই একই সময়ে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে— জম্মু ও কাশ্মীরে এই মুহূর্তে সক্রিয় ১৩১ জন জঙ্গি। চমকে যাওয়ার মতো তথ্য হল, এর মধ্যে ১২২ জনই পাকিস্তানি নাগরিক! বাকি ৯ জন স্থানীয়। অর্থাৎ, আমাদের ঘরের দোরগোড়ায় যারা বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে, তাদের সিংহভাগই ওই ‘মহড়া’ চালানো দেশটির রপ্তানি করা ‘পণ্য’।
জম্মু রিজিয়নেই ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩৫ জন পাকিস্তানি জঙ্গি। পীর পাঞ্জালের দক্ষিণে ফের সন্ত্রাসের জাল বোনার চেষ্টা চলছে পুরোদমে। ড্রোন দিয়ে অস্ত্র আর বিস্ফোরক ফেলার বিরাম নেই। অথচ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান নিজেকে তুলে ধরছে ‘সন্ত্রাস-বিরোধী’ যুদ্ধের শরিক হিসেবে। আর আমেরিকা? তারা সব জেনেও যেন ধৃতরাষ্ট্র! এক গাল হেসে সেই পাকিস্তানের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছে। একে দ্বিচারিতা বলব, না কি স্বার্থের অন্ধত্ব?
আমেরিকার এই ভূমিকা সত্যিই বিস্ময়কর। তারা কি জানে না ১২২ জন পাকিস্তানি জঙ্গি কাশ্মীরে কী করছে? নাকি জেনেও না জানার ভান? গত বছর মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর পাকিস্তান একটু কোণঠাসা হয়েছিল। সন্ত্রাসের পরিকাঠামোয় ভারতের ওই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বুঝিয়ে দিয়েছিল, দিন পাল্টাচ্ছে। সেই ধাক্কা সামলাতে এখন আবার ওয়াশিংটনের দরজায় কড়া নাড়ছে ইসলামাবাদ। আর অদ্ভুতভাবে, ওয়াশিংটনও দরজা খুলে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা খুব সহজ এবং সোজাসাপ্টা। আমেরিকা আসলে কী চায়? একদিকে তারা ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের কথা বলে, আর অন্যদিকে ভারতের পিঠে ছুরি মারা শক্তির সঙ্গে মহড়া দেয়। এটা কি সেই পুরনো ‘কৌশল’— সাপ হয়ে কাটো আর ওঝা হয়ে ঝাড়ো?
পাকিস্তানের ভণ্ডামির কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। তাদের মুখের বুলি আর মাঠের কাজের ফারাক আকাশ-পাতাল। বর্ডারের ওপার থেকে জঙ্গিদের মদত দেওয়া, অনুপ্রবেশ করানো— এসবই তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমেরিকার মতো দেশ যখন সেই রাষ্ট্রকেই ‘সন্ত্রাস দমনের’ পার্টনার বানায়, তখন সন্ত্রাসবাদ নামক দানবটা আড়ালে মুচকি হাসে।
‘ইনস্পায়ার্ড গ্যামবিট’ বা অনুপ্রাণিত চাল— নামটা বেশ যুতসই। কিন্তু এই চালে কিস্তিমাত কে হবে? ভারত কিন্তু চুপ নেই। সীমান্তে আমাদের জওয়ানরা কড়া জবাব দিচ্ছেন। ড্রোন নামানো হচ্ছে, অনুপ্রবেশ রুখে দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্ব রাজনীতির এই নির্লজ্জ দ্বিচারিতা দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক— সন্ত্রাস দমনের এই লড়াই কি আসলে লোক দেখানো? না হলে, যাদের হাতে রক্তের দাগ, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোন শান্তির বার্তা দিচ্ছে আমেরিকা?
