Himalayan Orchid Disaster and Local weather Change | পাহাড়ের বাঁকে বুনোফুলের কান্না, বদলে যাচ্ছে ঋতুচক্র, দার্জিলিং হিমালয়ে অস্তিত্বের সংকটে অর্কিড-রডোডেনড্রন

Himalayan Orchid Disaster and Local weather Change | পাহাড়ের বাঁকে বুনোফুলের কান্না, বদলে যাচ্ছে ঋতুচক্র, দার্জিলিং হিমালয়ে অস্তিত্বের সংকটে অর্কিড-রডোডেনড্রন

ব্লগ/BLOG
Spread the love


গত এক শতাব্দীতে পূর্ব হিমালয়ের গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। উদ্ভিদ বিক্ষানীরা বলছেন, আপাতভাবে সামান্য মনে হওয়া এই পরিবর্তনটুকুও অর্কিডদের কাছে মরণফাঁদ। 

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, দার্জিলিং: পাকদণ্ডি বেয়ে ওঠা পাহাড়ের বাঁকে বা সিঙ্গালিলা অভয়ারণ্যের নির্জন এলাকায় যে রডোডেনড্রন একসময় বৈশাখের শুরুতে লাল আগুন জ্বালিয়ে দিত, এখন তা ফাগুনের মাঝপথেই জ্বলে উঠেছে। দার্জিলিং হিমালয়ের উচ্চতাভেদে যে ফুলগুলোর ফোটার একটা অলিখিত পঞ্জিকা ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের (Himalayan Orchid Disaster and Local weather Change) করাল গ্রাসে সেই ক্যালেন্ডার আজ ওলটপালট। হিমালয়ের এই নিভৃত কন্দরে নিঃশব্দে ঘটে চলেছে এক বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়, পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যাকে বলছেন, ‘ফেনোলজিক্যাল শিফট’, গোদা বাংলায় ঋতুচক্রের বিবর্তন। মেঘ-কুয়াশার চাদরে ঢাকা এই পাহাড়ে অর্কিড (Orchid) এবং বন্যফুলেরা কেবল সৌন্দর্যের পসরা নয়, তারা আসলে পাহাড়ের স্বাস্থ্যের ব্যারোমিটার। অথচ গত দুই দশকে দার্জিলিংয়ের (Darjeeling) গড় তাপমাত্রা যে হারে বেড়েছে, তাতে এই নীরব শিকারদের অস্তিত্ব আজ খাদের কিনারায়। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছেন, অর্কিড এবং বন্যফুলেরা পালটে দিচ্ছে তাদের জৈবিক আচরণ, যা হিমালয়ের সামগ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য এক অশনিসংকেত।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক শতাব্দীতে পূর্ব হিমালয়ের গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আপাতভাবে সামান্য মনে হওয়া এই পরিবর্তনটুকুও অর্কিডদের কাছে মরণফাঁদ। অর্কিড অত্যন্ত সংবেদনশীল উদ্ভিদ। তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট আর্দ্রতা এবং বিশেষ এক ধরনের মাইক্রোক্লাইমেট। গবেষকরা বলছেন, ‘ডেনড্রোবিয়াম’ বা ‘সিম্বিডিয়াম’ প্রজাতির অর্কিডগুলো এখন আর আগের মতো গভীর জঙ্গলে দেখা যাচ্ছে না। তাদের অভিমত, বৃষ্টির ধরনে ব্যাপক বদল আসার ফলে অর্কিড যে গাছগুলোর ওপর আশ্রয় নিয়ে বাঁচে (এপিফাইট), সেই গাছগুলোর বাকল শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবে ওই পরজীবী বা আশ্রয়ী উদ্ভিদগুলো অকালে মারা পড়ছে। আগে জুন-জুলাই মাসের মৌসুমি বৃষ্টির যে ছন্দ ছিল, এখন তা বদলে গিয়ে কখনও দীর্ঘ খরা আবার কখনও মেঘভাঙা বৃষ্টিতে পর্যবসিত হয়েছে। এই অনিয়মিত বর্ষণ অর্কিডের পরাগায়ন বা পলিনেশন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানী মনোরঞ্জন চৌধুরীর কথা, ‘আবহাওয়া বা জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গোটা ব্যবস্থাই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে ফুল ফুটলে তা আগেই ঝরে গিয়ে বীজ তৈরি করছে। সেই বীজ অঙ্কুরোদ্গমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বা উপাদান (যেমন- জল) না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ না করলে এই সমস্যা বাড়তেই থাকবে।’

সাম্প্রতিক নানা বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, ফুল ফোটা এবং পতঙ্গদের জেগে ওঠার মধ্যে যে হাজার বছরের সূক্ষ্ম সমন্বয় ছিল, হিমালয়ের এই অঞ্চলে তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। একে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ট্রফিক মিসম্যাচ’। উদাহরণ দিয়ে গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির অর্কিড ফোটার সময় যদি এক মাস এগিয়ে আসে, তবে সেই সময় ওই ফুলের পরাগায়ন ঘটানো নির্দিষ্ট পতঙ্গটি বা মৌমাছিটি হয়তো ডিম ফুটে বেরোয়নি। এর ফলে ফুলটি পরাগায়িত না হয়েই ঝরে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সেই প্রজাতির বংশবৃদ্ধি থেমে যাচ্ছে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি উপত্যকায় এভাবেই নানা প্রজাতির অর্কিড হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার ফলে অর্কিডগুলো এখন আরও ওপরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পাহাড়ের উচ্চতা তো আর অসীম নয়, ফলে একসময় তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাবে এবং বিলুপ্তিই হবে একমাত্র ভবিতব্য।

গবেষকরা বলছেন, কেবল অর্কিড নয়, উত্তরবঙ্গের গর্ব রডোডেনড্রন এবং ম্যাগনোলিয়ার অবস্থাও তথৈবচ। রডোডেনড্রন মূলত মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে রক্তিম আভা ছড়াত, এখন তা জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই প্রস্ফুটিত হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সুভাষচন্দ্র রায়ের বক্তব্য, ‘অসময়ে ফুল ফোটার ফলে ফুলে মধুর পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে পাহাড়ি পাখি এবং পোকামাকড়ের খাদ্যশৃঙ্খলেও। হিমালয়ের এই পরিবর্তন আসলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এক স্থানীয় প্রতিচ্ছবি।’

মনোরঞ্জন জানিয়েছেন, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় বিদেশি উদ্ভিদ বা ‘এলিয়ান স্পিসিস’-এর চাইতেও বেশি ক্ষতি হচ্ছে স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদকুলের। ব্রিটিশ আমলে দার্জিলিংয়ের যেসব ঢালে অর্কিডের মেলা বসত, আজ সেখানে কংক্রিটের জঙ্গল অথবা বিদেশি প্রজাতির পাইন গাছের একচেটিয়া রাজত্ব। ওই পাইন গাছের পাতা মাটি অম্লীয় করে তোলে, যা দেশি বন্যফুল বা বিরল প্রজাতির ফার্ন জন্মানোর পরিপন্থী। হিমালয়ের অর্কিড নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই কাজ করছেন সুরজিৎ রায়। তাঁর কথা, ‘১৯৫০-এর দশকেও সুকিয়াপোখরি, মানেভঞ্জন, বিজনবাড়ি সহ বিভিন্ন এলাকায় যেসব অর্কিড অনায়াসে মিলত, এখন সেগুলো খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব। হারিয়ে যেতে বসা এই অর্কিডের তালিকা বেশ লম্বা।’

তথ্য বলছে, দার্জিলিং হিমালয়ের তিনশোর বেশি প্রজাতির অর্কিডের মধ্যে অন্তত তিরিশ শতাংশ এখন ‘বিপন্ন’ তালিকায়। যদি বনসৃজন নীতিতে বৈজ্ঞানিক বদল না আনা যায় এবং পাহাড়ি ঝরনা ও আর্দ্র এলাকাগুলো সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে পাহাড়ের জীবন্ত রত্নগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় বা পুরোনো হারবেরিয়াম শিটেই বন্দি থাকবে বলেই মনে করছেন গবেষককুল। প্রকৃতির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে গড়ে তোলা দার্জিলিংয়ের কংক্রিটের জঙ্গলের আড়ালে এখন তাই এক নিঃশব্দ হাহাকার জমেছে। জলবায়ুর এই বিরূপ আচরণ রুখতে না পারলে কেবল বুনো ফুলই হারিয়ে যাবে না, তারসঙ্গে হারাবে পাহাড়ের আদিম ঘ্রাণ। বিবর্তন নয়, আসলে মানুষের লোভ আর অবহেলার বলি হতে হতে অর্কিডেরা আজ যেন ধূসর পাহাড়ের বুকে এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *