সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর: প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে হরিশ্চন্দ্রপুর (Harishchandrapur) রাজ্য এমনকি ভারতবর্ষের মানচিত্রে অর্থকরী ফসল মাখনার জন্য এক বিশেষ জায়গা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গের এই হরিশ্চন্দ্রপুর মাখনা উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াকরণ এবং দেশে ও বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য জায়গায় রয়েছে। গোটা মালদা জেলাতেই প্রতিবছর মাখনাতে কয়েকশো কোটি টাকার টার্নওভার হয়। কিন্তু প্রকৃত চিত্র অন্য। এই শিল্পের যাঁরা প্রাণ অর্থাৎ বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলা থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁদের হাত ধরে এই মাখনা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে তাঁরা থাকেন অন্ধকারে। তাঁদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে বাসস্থানের পরিকাঠামো সবটাই যেন কেমন অন্ধকারাছন্ন। দ্বারভাঙ্গা থেকে আসা ওই শ্রমিকের দল নিজেদের পরিবার নিয়ে হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার বিভিন্ন ফরিতে বছরের ছয় থেকে আট মাস বসবাস করে। সেখানে অস্থায়ী কাঁচা বাড়িগুলি বাসস্থানের অযোগ্য। কোনওরকমে বেড়া দিয়ে দাঁড় করানো ঘর, মাথার ওপর টালি কিংবা টিন। শীতে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে বসবাস করে শ্রমিক পরিবারগুলি। একেকটি ফড়িতে প্রায় কুড়ি থেকে ২৫টি পরিবার থাকে। যদিও সমস্তটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তাঁদের ব্যবহারের জন্য শৌচালয় মাত্র একটি। সেটিও অস্বাস্থ্যকর। অর্থাৎ ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু সহ বৃদ্ধের জন্য বরাদ্দ একটি থেকে দুটি মাত্র শৌচালয়। দ্বারভাঙ্গার কেউটিয়া গ্রামের বাসিন্দা অযোধ্যাপ্রসাদ সাহানির কথায়, ‘প্রতিবছর হরিশ্চন্দ্রপুরে আসি। সঙ্গে পরিবারও থাকে। কিন্তু এখানে আমাদের জন্য যে ধরনের ঘর দেওয়া হয় তাতেই বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। কী করব পেটের তাগিদ? শীত এবং বর্ষাতে কষ্ট হয় তবুও রোজগারের জন্য মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হয়।’
প্রসূতি কিংবা সন্তান জন্ম দেওয়া মা এবং শিশুদের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল বড় শূন্যতা। শুধুমাত্র পরিযায়ী হওয়ার কারণে স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের হাতে ঠিকমতো রেকর্ড থাকছে না এই সমস্ত মা, শিশু এবং প্রসূতিদের। বছরের ছয় মাস থেকে আট মাস পশ্চিমবঙ্গে বাকি কয় মাস বিহারে। এর মাঝেই সন্তান গ্রহণ থেকে সন্তান জন্ম দেওয়া সবটাই চলছে তাদের মধ্যে। সেক্ষেত্রে দুই রাজ্যের টানাটানিতে এবং সর্বোপরি ভ্যাকসিন নেওয়ার কার্ডে দুই রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সঠিকভাবে রেকর্ড না থাকায় উপযুক্ত ভ্যাকসিন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মা এবং শিশু উভয়ে। শুধু তাই নয়, তাঁদের জন্য এলাকার অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতেও কোনও শিক্ষার ব্যবস্থা করছেন না মাখনা প্রক্রিয়াকরণে জড়িত ব্যবসায়ী এবং ফড়ি মালিকরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই বেড়ে উঠছে শ্রমিক পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
এলাকায় কাজ করা স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মধুমিতা রায় বলেন, ‘আমরা হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার বিভিন্ন ফড়িগুলিতে গিয়ে মাঝে মাঝে প্রচার চালাই যাতে ওদের বাচ্চাদের ওরা স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে ভর্তি করায়। প্রসূতিদেরকেও আমরা জানাই তাদের জন্য নিউট্রিশনের ব্যবস্থা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে রয়েছে।’
মাখনা ব্যবসায়ী শেখ খলিল বলেন, ‘মাখনা থেকে সরকার পাঁচ শতাংশ জিএসটি নিচ্ছে। এলাকার অর্থনীতির উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন পরিকাঠামো এবং শ্রমিকদের অবস্থা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ করছে না।’
এই ব্যাপারে হরিশ্চন্দ্রপুর (১) বিডিও সৌমেন মণ্ডল বলেন, ‘শ্রমিকদের জন্য কমিউনিটি টয়লেট গড়ে দেওয়ার প্রস্তাব এলে ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে অবশ্যই তা করা হবে।’ শ্রমিকদের স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্বিগ্ন ব্লক স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা। হরিশ্চন্দ্রপুর–১ বিএমওএইচ ডাঃ ছোটন মণ্ডলের কথায়, ‘ওরা বছরের একটা সময় হরিশ্চন্দ্রপুরে অন্য সময় বিহারে থাকে। দেখা যায় প্রাক-গর্ভকালীন অবস্থায় বিহারে রয়েছে প্রসবটা হয়তো হরিশ্চন্দ্রপুরে হয়েছে। সেক্ষেত্রে মা ও শিশুর জন্য যেগুলো টিকার প্রয়োজন সেগুলো দুই রাজ্যের আসা-যাওয়াতে গ্যাপ পড়ে যাচ্ছে। আমরা যদিও এ বিষয়ে ওদের সচেতন করছি।’
