পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশ নম্বর, ক্লাসে প্রথম পাঁচে, শিক্ষকদের প্রশংসা, আত্মীয়দের অভিনন্দন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু এই দুর্দান্ত রিপোর্ট কার্ডের আড়ালে অনেক শিশু নিঃশব্দে লড়াই করে চলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, আত্মসন্দেহ এবং আবেগজনিত ক্লান্তির সঙ্গে। কারণ, সব কষ্ট নম্বরে ধরা পড়ে না।
আমাদের এখানে প্রতিটি পরিবারে সন্তানের ভালো ফল গর্বের অন্যতম কারণ। বাবা-মা চান সন্তান সফল হোক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। সেই ইচ্ছা থেকেই ভালো নম্বরের জন্য উৎসাহ, পুরস্কার, প্রশংসা। কিন্তু অজান্তেই অনেক সময় শিশুদের মনে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, তাদের মূল্য, ভালোবাসা বা গ্রহণযোগ্যতা শুধুই সাফল্যের উপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন:
বাস্তবতা হল, অনেক শিশু নিজের কষ্টের কথা কাউকে জানায় না। তারা ভয় পায়, দুর্বলতা প্রকাশ করলে বাবা-মা হতাশ হবেন, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করবেন বা তাদের নিয়ে গর্ব কমে যাবে। তাই বাইরে হাসিমুখে সব সামলেও ভেতরে ভেতরে তারা ভেঙে পড়তে থাকে।
আরও পড়ুন:

গবেষণাও একই কথা বলছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছাত্রছাত্রী উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত চাপে ভোগে। অনেকেই মনে করে, বাবা-মায়ের প্রত্যাশা সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এমন চাপ চলতে থাকলে তা উদ্বেগ, পারফেকশনিজম, আত্মবিশ্বাসের অভাব এমনকী বিষণ্ণতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নম্বর নয়, সন্তানের প্রতিদিনের আচরণের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোর দিকেও নজর রাখা জরুরি। কারণ, মানসিক চাপে থাকা শিশুরা অনেক সময় সরাসরি কিছু না বললেও তাদের আচরণই সব বলে দেয়।
১. নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত একই কাজ বারবার করা
হোমওয়ার্ক বারবার নতুন করে লেখা, উত্তর মুছে আবার লেখা বা ‘পারফেক্ট হয়নি’ বলে কাজ জমা দিতে না চাওয়া শুধু যত্নশীল হওয়ার লক্ষণ নয়। অনেক সময় এটি পারফেকশনিজমের ইঙ্গিত। এমন শিশুরা ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে নয়, নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
২. বারবার মাথাব্যথা বা পেটব্যথার অভিযোগ
স্কুলে যাওয়ার আগে, পরীক্ষার সময় বা বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানের আগে যদি নিয়মিত মাথাব্যথা, পেটব্যথা, ক্লান্তি বা বমিভাবের কথা বলে, অথচ শারীরিক কোনও কারণ না পাওয়া যায়, তাহলে তার পেছনে মানসিক চাপ কাজ করতে পারে।

৩. স্কুলে ভালো ব্যবহার, বাড়ি ফিরেই রাগ বা কান্না
অনেক বাবা-মা অবাক হন, স্কুলে যে সন্তান এত শান্ত, সে বাড়ি ফিরেই কেন রেগে যায় বা কান্নাকাটি শুরু করে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুলে সারাদিন নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে রাখার পর বাড়িকেই শিশুরা নিরাপদ জায়গা মনে করে। তাই জমে থাকা চাপ অনেক সময় সেখানেই বেরিয়ে আসে।
৪. নিজেকে ছোট করে দেখা
‘আমি কিছুই পারি না’, ‘আমি খুব বোকা’, ‘আমায় দিয়ে কিছু হবে না’— এ ধরনের কথা যদি বারবার বলে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করা অনেক সময় আত্মরক্ষার কৌশল হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি।
৫. সবসময় আশ্বাস বা ছোট বিষয়েও ক্ষমা চাওয়া
‘আমি ঠিক করেছি তো?’, ‘তুমি কি রাগ করেছ?’, ‘আমি কি ভুল করেছি?’— এ ধরনের প্রশ্ন যদি বারবার করে, তাহলে বুঝতে হবে সে নিজের মূল্য অন্যের অনুমোদনের মাধ্যমে বিচার করছে। এ ধরনের অভ্যাস ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
৬. খেলাধুলাতেও আনন্দ হারিয়ে যায়
খেলা শুধু সময় কাটানোর উপায় নয়, এটি শিশুদের মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যদি আগে যে শিশু আঁকতে, গল্প লিখতে, কল্পনার খেলায় মেতে থাকতে ভালোবাসত, সে এখন শুধু ফল বা লক্ষ্যভিত্তিক কাজেই আগ্রহ দেখায়, তাহলে সেটি মানসিক চাপে থাকার ইঙ্গিত হতে পারে।

৭. বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে
ভালো রেজাল্টের আড়ালে সবচেয়ে সহজে যে পরিবর্তনটি চোখ এড়িয়ে যায়, সেটি হল সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিবারের সঙ্গে গল্প করা বা প্রিয় শখগুলো থেকে দূরে সরে গিয়ে যদি শুধু পড়াশোনাতেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখে, তাহলে সেটি মানসিক ক্লান্তির লক্ষণ হতে পারে।
অভিভাবকদের কী করা উচিত?
শিশুর কাছ থেকে প্রত্যাশা রাখা ভুল নয়। কিন্তু তাকে এমনটা বোঝানো জরুরি যে, নম্বরের জন্য নয়, সে যেমন, তেমনভাবেই সে পরিবারের কাছে মূল্যবান। তাই শুধু ফলাফল নয়, তার চেষ্টা, কৌতূহল ও পরিশ্রমের প্রশংসা করুন। ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতে শেখান। প্রতিদিন কিছুটা সময় শুধু তার কথা শোনার জন্য রাখুন। অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে সন্তান নির্দ্বিধায় নিজের ভয়, কষ্ট বা ব্যর্থতার কথা বলতে পারে।
একটি রিপোর্ট কার্ড শুধু বলে দেয়, সন্তান পড়াশোনায় কতটা ভালো করছে। কিন্তু তার মন কতটা ভালো আছে, সেটি জানার জন্য নম্বর নয়, প্রয়োজন বাবা-মায়ের সময়, মনোযোগ এবং সংবেদনশীলতা।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
