রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : রাজনীতি থেকে ‘সন্ন্যাস’ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। মাঝে বেশ কয়েকদিন শিলিগুড়িতে ছিলেন না। তবে, পুরভোটের আগে আবার রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হচ্ছেন গৌতম দেব। মমতার ‘অনুগত সৈনিক’ শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র বিজেপিকে রুখতে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঐক্য চাইছেন। সোমবার দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক বৈঠকে মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের দার্জিলিং জেলা চেয়ারম্যান গৌতম বলেছেন, ‘গত বিধানসভা ভোট অবাধ হয়নি। ভোটে ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে।’ শিলিগুড়িতে আগামী পুরভোটও অবাধ, শান্তিপূর্ণ হওয়ার আশা দেখছেন না গৌতম। সেইজন্য তাঁর বক্তব্য, ‘সবাই মিলে বিজেপির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’
গৌতমের বক্তব্যে কিছুটা হলেও সায় রয়েছে প্রবীণ সিপিএম নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের। তাঁর বক্তব্য, ‘বিজেপিকে তো হারাতেই হবে। দেশজুড়ে বিজেপির ফ্যাসিস্ট নীতির বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলন চলছে। তবে, আগামী পুরভোটের নীতি নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি।’ তবে, শিলিগুড়ির বিধায়ক তথা মন্ত্রী শংকর ঘোষ বলেছেন, ‘সিপিএম চরম হিন্দুবিদ্বেষী এবং তৃণমূল কংগ্রেস চরম সংখ্যালঘু তোষণকারী দল। ওরা তো আগে থেকেই একজোট ছিল। নতুন করে আবার জোটের কী আছে? খুব বেশি হলে তিনটে শূন্য পাবে।’ তাঁর সংযোজন, ‘সন্ত্রাস, বিরোধীদের ওপরে অত্যাচারের গল্প গৌতম দেবের মতো প্রবীণ রাজনীতিকের মুখে মানায় না। ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের পরে রাজ্যে তৃণমূলের সন্ত্রাস মানুষ ভোলেননি। এসব না বলে গৌতমবাবুর বিশ্রাম নেওয়া উচিত।’
সদ্য রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় সংগঠন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। ফলে এই শক্তি নিয়ে এককভাবে শিলিগুড়ির পুরভোটে লড়াই যে সম্ভব নয়, তা বুঝছেন গৌতমের মতো পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি বিরোধীদের এককাট্টা হওয়ার জন্য সওয়াল করেছেন তিনি। সোমবার তিনি বলেছেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেছে বেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করাচ্ছে। যুব নেতা সৌরভ ভাস্কর, ছাত্র নেতা বিশ্বজিৎ সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে দুজনকেই জেলে পুরেছে।’ এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা দলের নেতা দেবাশিস দে-কে মাঝরাতে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা নিয়ে এবং ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলারের বাড়িতে হামলার পরেও পুলিশ অভিযোগ না নেওয়ায় প্রশ্ন তোলেন গৌতম। তাঁর দাবি, ‘পুলিশ পুরোপুরি বিজেপির কথায় চলছে। তৃণমূল নেতাদের বাড়িতে হামলা নিয়ে পুলিশের কর্তাদের কাছে নালিশ জানিয়েও কাজ হচ্ছে না।’
শিলিগুড়ির রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিজেপির আমলে নষ্ট হচ্ছে বলে গৌতম দাবি করেছেন। এসব নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের কথা বলেছেন তিনি। তবে, কবে তৃণমূল রাস্তায় নামবে, সেই বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। গৌতম এদিন বলেছেন, ‘যেভাবে প্রশাসন বিজেপির হয়ে কাজ করছে, তাতে শিলিগুড়িতে পুরভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হওয়া কঠিন।’ তবে, যদি মানুষ নিজের ভোট দিতে পারে, বিজেপি যদি ইভিএমে কারচুপি না করে, তবে তাঁদেরই জয় হবে বলে প্রাক্তন মেয়র মনে করেন। তিনি এদিন বলেছেন, ‘বিজেপিকে হারাতে গণতন্ত্রপ্রিয় সমস্ত রাজনৈতিক দলকেই আমরা একজোট হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সবাই মিলেই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে হবে।’ তাঁর দাবি, ‘বিধানসভা নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। শিলিগুড়িতেও পোস্টাল ব্যালটের বাক্স ভাঙা ছিল। অভিযোগ জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। তাই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই আমরা পুরভোটে নামব। ইভিএমে যাতে কারচুপি না করতে পারে, সেদিকে আমরা সবরকম নজর রাখব। পথ-মত ভিন্ন হলেও সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একত্রিত হওয়া উচিত।’
গৌতমের কথায় সায় দিলেও পুরভোট নিয়ে এখনই কিছু বলতে চাইছে না কংগ্রেস। দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস সভাপতি সুবীন ভৌমিক বলেছেন, ‘আমরা আগেই বলেছি যে, দেশ এবং রাজ্য অস্থির অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে। এর মোকাবিলায় সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বিজেপির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। তবে, শিলিগুড়িতে পুরভোটে দলের অবস্থান দলের কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতৃত্ব ঠিক করবে।’

