নাগরাকাটা: দৃশ্য একঃ গ্রাসমোড় চা বাগান লাগোয়া ১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে বালুখোলা নদীতে জরুরীকালীন জালিবাঁধ তৈরির কাজ করছিলেন ৪ শ্রমিক। সেই সময় আচমকাই সেখানে হরপা বান (Flash-Flood) আসে। হঠাৎ আসা এই হরপা বাণে তাঁদের তখন প্রায় ভেসে যাওয়ার যোগাড়। তবে কাছেই ছিল একটি আর্থ মুভার। পড়িমড়ি সেটাতে উঠে রক্ষা পান তাঁরা। ঘটনার শেষ এখানেই নয়।
দৃশ্য দুইঃ ক্যারন চা বাগান লাগোয়া চুপাতাং নদী পেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হরপা বাণের কবলে পড়ে কয়েক ঘন্টা একটি পাথরের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তরুণ। এই দৃশ্য দেখে চারদিকে তখন গেল গেল রব। এই পরিস্থিতিতে নিজের জীবন বাজি রেখে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা নদী সাঁতরে গিয়ে ওই তরুণকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এক ব্যক্তি।
হরপার এই ভয়ঙ্কর ছবি দুটি শুক্রবার বিকেলের। দুটি নদীই প্রতিবেশী দেশ ভুটান (Bhutan) থেকে নেমে আসা। কোনও বিপর্যয়ের খবর না মিললেও এদিন একইভাবে গাঠিয়া, কুজি ডায়নার মত নদীগুলিও সেসময় হঠাৎ করে ফুলে ওঠে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল বলে জানা গিয়েছে।
প্রথম ঘটনাটির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয়রা জানান, গ্রাসমোড়ের নন্দুমোড়ের সামনের বালুখোলা বরাবরই খেয়ালী। নদীর মতিগতি কখন যে কেমন হবে তাঁর আগাম অনুমান অসম্ভব। এদিনও বিকেল ৩ টা নাগাদ সেরকম ঘটনাই ঘটে। হঠাৎ করে হরপা বাণ চলে আসে হাঁটু জলের নদীতে। মুহুর্তের মধ্যে বিধ্বংসী হয়ে ওঠে খামখেয়ালি বালুখোলা। সেসময়ই সেখানে কাজ করছিলেন গোবিন্দ দাস, রবীন্দর ছেত্রী, অজিত তোষা ও ফুলেন তোষা নামে ৪ শ্রমিক। গত সোমবার থেকে নদী ভাঙনের হাত থেকে জাতীয় সড়ককে বাঁচাতে ওই কাজটি শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে এক শ্রমিক বলেন, “মন দিয়ে বোল্ডার বাঁধার কাজ করছিলাম। সেসময় তেমন জল ছিল না। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি কাঁদামাখা জল এসে নদী ভরিয়ে দিল। বিপদ বুঝে ৪ জন মিলেই আগে থেকেই নদীবক্ষে থাকা আর্থ মুভারে উঠে পড়ি। এরপর চালক পাড়ে নিয়ে আসে।” একথা বলার সময় ঘটনার আধ ঘন্টা পরেও তাঁদের চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।
বছরের অন্য সময়ে শীর্ণ হয়ে থাকা পাহাড়ি নদীটি ফি বছরই বর্ষাকালে যখন তখন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। এর আগে বালুখোলার (Balukhola) পুরনো সেতুটি বিধ্বংসী জলোচ্ছাসে ভেসে যায়। পরে নতুন সেতু তৈরির জন্য ডাইভারসন তৈরি করে দেওয়ার পরে দুবার সেটাও ধূলিসাৎ হয়। গত বছরের ৪ অক্টোবরের বিধ্বংসী প্লাবনে বালুখোলার জল উপচে গ্রাসমোড়ের ২ দুই নম্বর লাইন সহ নদীর গতিপথের ধার বরাবর ঘাসমারি বস্তীর মহেন্দ্রধূড়া, ছাড়টন্ডু বস্তীতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে। ওই বস্তীর সরকারী প্রাথমিক স্কুল কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। সে বারই ভাঙন রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। চলতি বর্ষায় তা আরও বাড়তে শুরু করে। যে কারণে আর কালবিলম্ব না করে গাইড বাঁধ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
এবার আসা যাক দ্বিতীয় ঘটনায়। চুপাতাং নদীতে হঠাৎ আসা হরপায় যে তরুণ ফেঁসে গিয়েছিল তাঁর নাম আরমান সুরি কাপলি (১৮), বাড়ি ক্যারনের গেট লাইনে। এদিন দুপুরে ব্যক্তিগত কাজে সে লুকসান বাজারে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় সেখানে আটকে পড়ে সে। তীব্র স্রোতের কারণে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে প্রচুর স্থানীয়রা জড়ো হলেও ফুঁসে ওঠা নদীতে নেমে কারও পক্ষেই কিছু করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেসময় বাগানের রাজেশ ওরাওঁ নামে এক ব্যক্তি নিজের জীবন বিপন্ন করেও নদীতে ঝাঁপ দেন। বহু কষ্টে আরমানের কাছে পৌঁছে তাঁকে পাড়ে নিয়ে আসেন। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই নাগরাকাটা থানার পুলিশও সেখানে পৌঁছয়। রাজেশের বীরত্ব দেখে তাঁকে কুর্ণিশ জানিয়েছেন প্রত্যেকেই।

