উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবল বেসরকারীকরণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর এবার চেয়ার বাঁচাতে মরিয়া ফিফা (FIFA) সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino)। উয়েফা ও কনকাকাফের মতো শক্তিশালী ফুটবল সংস্থাগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে যখন তাঁর ক্ষমতা টালমাটাল, ঠিক তখনই তাঁর পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়াল মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ৬টি আরব দেশের ফুটবল ফেডারেশন। বৃহস্পতিবার এক যৌথ বার্তায় কাতার, মিশর, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, লেবানন ও সুদান ইনফান্তিনোর ওপর তাদের “পূর্ণ আস্থা” প্রকাশ করেছে।
ফিফার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে যখন বৈশ্বিক ফুটবল দ্বিধাবিভক্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে আরব দেশগুলোর এই একাট্টা সমর্থন ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অক্সিজেন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মরক্কো (২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক), কাতার, মিশর, মৌরিতানিয়া, লেবানন ও সুদানের ফুটবল প্রধানরা একটি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবলের সামগ্রিক বিকাশ ঘটেছে। তাঁরা ইনফান্তিনোর সঙ্গে ভবিষ্যতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই ছয় দেশের মধ্যে চারটির প্রধান—কাতারের শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি, মিশরের হানি আবো রিদা, মরক্কোর ফৌজি লেকজা এবং মৌরিতানিয়ার আহমেদ ইয়াহিয়া—ফিফা কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
তবে কাতার ও লেবাননের এই পদক্ষেপ এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) অফিশিয়াল অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। মহাদেশীয় সংস্থার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আঞ্চলিক বা ধর্মীয় রাজনৈতিক ব্লককে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই ঘটনা বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে ইনফান্তিনোর ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ স্কিমের অধীনে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির একটি ২০ বিলিয়ন ডলারের বিতর্কিত প্রস্তাব। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা (UEFA), উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফ (CONCACAF) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) যৌথভাবে চিঠি দিয়ে এই পদক্ষেপকে “আস্থার মারাত্মক লঙ্ঘন” এবং “প্রতারণা” বলে আখ্যা দেয়। এমনকি উয়েফা ফিফার সমস্ত ম্যাচ বয়কটেরও হুমকি দেয়, যার মুখে ইনফান্তিনো প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
পরপর ইউরোপীয় ও অন্যান্য দেশের সমর্থন প্রত্যাহারের জেরে আগামী মার্চে হতে যাওয়া ফিফা নির্বাচনে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচিত হওয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইনফান্তিনোর পুনঃনির্বাচনে আর সমর্থন দেবে না। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে। নিউজিল্যান্ড ফুটবলও তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, ফিফার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আস্থা ধসে পড়েছে।
২০১৬ সাল থেকে ফিফার শীর্ষ পদে থাকা জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এতদিন ২০২৭ সালের নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের পথে ছিলেন। তবে বেসরকারীকরণ প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর ফুটবলের পরাশক্তি দেশগুলোর এই সম্মিলিত বিদ্রোহ তাঁর অবস্থান নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ফিফা আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত নতুন সভাপতি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের আবেদন করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। একদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রশাসনিক অসন্তোষ, অন্যদিকে আরব বিশ্বের পূর্ণ সমর্থন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

