গ্যাংটক: বরফে ঢাকা এক আদিগন্ত রুক্ষ এবং নির্জন প্রান্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা প্রায় ৫,২৫০ মিটার। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় যেখানে অক্সিজেনের অভাব পদে পদে, সেখানেই নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক রহস্যময় বন্যপ্রাণী। কান দুটোর মাথায় খাড়া তুলির মতো লোমের গুচ্ছ, গায়ে চমৎকার ছোপ ছোপ দাগ আর অপেক্ষাকৃত ছোট লেজ। নাম ইউরেশিয়ান লিংক্স (Eurasian lynx)। অত্যন্ত লাজুক এবং সতর্ক স্বভাবের এই মাঝারি আকারের বনবিড়াল সাধারণত মানুষের চোখের আড়ালেই থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু এবার আর লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। সিকিমের একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত মঙ্গন জেলার বিস্তীর্ণ ৎসো লামো মালভূমিতে পাতা ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এই বিরল প্রাণীটির পদচারণা।
সিকিমের (Sikkim) বন ও পরিবেশ দপ্তর এবং ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়া যৌথভাবে তুষার চিতা বা স্নো লেপার্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। আর সেই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবেই ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ওই চরম দুর্গম এলাকায় বসানো হয়েছিল অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা। গবেষকরা আশা করেছিলেন তুষার চিতার দেখা মিলবে। কিন্তু ক্যামেরা পরীক্ষা করার পর যে ছবি উঠে এল, তা দেখে রীতিমতো বিস্মিত বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটি ইউরেশিয়ান লিংক্স। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, সিকিমের বন্যপ্রাণ ইতিহাসে এই প্রথমবার ইউরেশিয়ান লিংক্সের উপস্থিতির এমন অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেল।
গোটা পূর্ব হিমালয়ে এই বিরল প্রাণীটির ক্যামেরাবন্দি হওয়ার ঘটনা এটি মাত্র দ্বিতীয়বার। এর ঠিক এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রতিবেশী রাজ্য অরুণাচলপ্রদেশে প্রথমবার এদের দেখা মিলেছিল। সাধারণত লাদাখ বা হিমাচলপ্রদেশের মতো পশ্চিম হিমালয়ের শুষ্ক ও উচ্চ পার্বত্য এলাকাতেই এদের বিচরণ সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হত। তাই পূর্ব হিমালয়ে এদের এই উপস্থিতি বন্যপ্রাণী গবেষক এবং পরিবেশপ্রেমীদের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।
ৎসো লামো মালভূমির এই আবিষ্কার বুঝিয়ে দেয়, সিকিমের এই উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলটি জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে কতটা অমূল্য। সাম্প্রতিক এই সমীক্ষায় শুধু ইউরেশিয়ান লিংক্স নয়, তুষার চিতা, পাল্লাস ক্যাট, তিব্বতি নেকড়ে, তিব্বতি স্যান্ড ফক্স এবং তিব্বতি গ্যাজেলের মতো আরও বেশ কিছু বিপন্ন প্রাণীর নিরাপদ বিচরণের প্রমাণ মিলেছে।

