উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, নাটকীয় এবং রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটির সাক্ষী থাকল ফুটবল বিশ্ব। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ১১১ মিনিটের এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও মেক্সিকো (England vs Mexico)। ৫টি গোল, ২টি পেনাল্টি, ১টি লাল কার্ড আর মাঠের পরতে পরতে ছড়ানো উত্তেজনা— ফুটবল ম্যাচ নয়, যেন চলল ১২ রাউন্ডের এক হেভিওয়েট বক্সিং লড়াই! শেষ পর্যন্ত ১০ জনে নেমে যাওয়া সত্ত্বেও মেক্সিকোকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে নিল ইংল্যান্ড। অন্যদিকে, কানাডার পর দ্বিতীয় আয়োজক দেশ হিসেবে শেষ ১৬ থেকেই চোখের জলে বিদায় নিতে হলো মেক্সিকোকে।
ম্যাচে নামার আগে সমস্ত পরিসংখ্যান ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। মেক্সিকোর মাটিতে এর আগে কখনো আয়োজকদের হারাতে পারেনি থ্রি-লাইন্সরা। তার ওপর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে এই আজতেকা মাঠেই দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের ক্ষত এখনো ভোলেনি ইংলিশ সমর্থকেরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,৫০০ ফুটের বেশি উচ্চতা, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং গ্যালারিতে ৮০,০০০ মেক্সিকান সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকার— টমাস টুখেলের দলের সামনে চ্যালেঞ্জটা ছিল হিমালয়সম।
ম্যাচের আগে মেক্সিকান সমর্থকদের উগ্র আচরণ কিংবা প্রতিপক্ষ কোচের হুংকারকে হালকাভাবে নেননি ইংল্যান্ডের মাস্টারমাইন্ড কোচ টমাস টুখেল। তিনি জানতেন, মেক্সিকোর ডিফেন্ডাররা হ্যারি কেনকে বোতলবন্দী করে রাখার ছক কষবে। আর ঠিক এখানেই কামড় দেন টুখেল। গোল করার মূল দায়িত্ব কেনের কাঁধ থেকে সরিয়ে তিনি সঁপে দেন তরুণ তুর্কি জুড বেলিংহ্যামের ওপর। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিতে ঠিক ৯৮ সেকেন্ডের এক ঝড় তোলেন বেলিংহ্যাম।
ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিট অবশ্য ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে চরম দাপট দেখায় মেক্সিকো। ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল শুরুতে চাপ সামলে প্রতি-আক্রমণে (Counter-attack) যাওয়া। সেই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন ঘটে ম্যাচের ৩৬ মিনিটে। খেলার গতির সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে মাত্র ৩টি পাসে গোল আদায় করে নেয় ইংল্যান্ড।
নিজেদের বক্সে বল ক্লিয়ার করে ডেকলান রাইসের উদ্দেশ্যে বাড়ান ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডন পিকফোর্ড। রাইস বল নিয়ে বেশ কিছুটা দৌড়ে পাস দেন উইঙ্গার বুকায়ো সাকাকে। ডান প্রান্ত থেকে সাকার বাড়ানো নিখুঁত ক্রসে উড়ন্ত হেডে বল মেক্সিকোর জালে জড়ান জুড বেলিংহ্যাম। মেক্সিকান ডিফেন্ডারদের সব নজর হ্যারি কেনের দিকে থাকায়, ফাঁকায় থাকা বেলিংহ্যাম কোনো ভুল করেননি।
ম্যাচ জয়ের পেছনে ইংল্যান্ডের তিন ফুটবলার সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন: ১. জুড বেলিংহ্যাম: ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী গোল এবং মাঝমাঠে শুরু থেকেই ছটফটে ফুটবল খেলে মেক্সিকোর রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রাখেন। ২. অ্যান্থনি গর্ডন: আগের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দুটি গোলেই অবদান রাখা গর্ডনকে আজ শুরু থেকেই খেলান টুখেল। পুরো ম্যাচ জুড়ে তাঁর গতি ও ড্রিবলিং নজর কেড়েছে। ৩. জর্ডন পিকফোর্ড: গোলবারের নিচে পিকফোর্ড প্রাচীর হয়ে না দাঁড়ালে শুরুতেই পিছিয়ে পড়তে হতো ইংল্যান্ডকে। ম্যাচের শুরুতেই রাউল জিমেনেজের এক বুলেট গতির হেড যেভাবে রুখে দেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। গোটা ম্যাচে আরও বেশ কয়েকবার নিশ্চিত পতনের হাত থেকে দলকে বাঁচান এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় আসল নাটক। মেক্সিকো ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলে ইংল্যান্ডের বক্সে একের পর এক ফাউলের ঘটনা ঘটে। রেফারি দুই দলকেই পেনাল্টি উপহার দেন। এর মাঝেই ইংল্যান্ডের এক ফুটবলার লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় টুখেলের দল। কিন্তু ১ জন কম নিয়েও দমে যায়নি তারা। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের তীব্রতায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১-১, ২-২ করে ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি ও দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে ৫ গোলের থ্রিলার শেষ করে ম্যাচ পকেটে পুরে নেয় ইংল্যান্ড।
গ্রুপ চ্যাটে বা মাঠের বাইরে যতই স্লেজিং হোক না কেন, মাঠের লড়াইতে আজ শেষ হাসি হাসল ইংল্যান্ডই। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে টুখেলের শিষ্যরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে মাঠে নামবে, তা বলাই বাহুল্য।

