সানি সরকার, শিলিগুড়ি: একরাতে ১২ বার! তাও আবার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রতিটির উৎসস্থল সিকিম পাহাড়। কবে এমন ধারাবাহিক কম্পন (Earthquake) অনুভূত হয়েছে উত্তরবঙ্গে এবং প্রতিটির ক্ষেত্রে উৎসস্থল সিকিম, মনে করতে পারছেন না আবহবিদ থেকে প্রবীণরা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত যেভাবে বারবার মাটি কেঁপেছে, তাতে আগামীর বড় বিপদ দেখছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। সম্প্রতি ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (বিআইএস) যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে, তাতে শুধু জোনের পরিবর্তন ঘটেনি, হিমালয় অঞ্চল যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। হিমালয়কে বাঁচাতে কী ধরনের নির্মাণ প্রয়োজন, সেই সংক্রান্ত পরামর্শও দিয়েছে বিআইএস। তবে আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া দপ্তরের সিকিমের কেন্দ্রীয় অধিকর্তা গোপীনাথ রাহা বলছেন, ‘একই জায়গায় ধারাবাহিক এমন কম্পন সাধারণত দেখা যায় না। তবে যেহেতু এই অঞ্চল ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা, ফলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’
শুরু হয়েছিল রাত ১টা ৯ মিনিটে। শুরুতেই মধ্যরাতে উত্তরবঙ্গের ঘুম ভাঙিয়ে দেয় ভূকম্পন। কিছুক্ষণের মধ্যে স্পষ্ট হয় উৎসস্থল সিকিমের মানেবাং থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ধরা পড়ে ৪.৫। শুক্রবার ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে শেষ কম্পন হয়। উৎসস্থল নামচি এবং রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ২.৯। কিন্তু এই দুটি কম্পনের মাঝে আরও ১০ বার কেঁপে ওঠে মাটি। চার ঘণ্টার কিছুটা বেশি সময়কালের মধ্যে একডজন কম্পনের মধ্যে হাফডজনের উৎসস্থল মংগন। বাকি ছয়টির মধ্যে নামচি কাঁপিয়েছে চারবার। ১২ বারের মধ্যে ৯ বারের গভীরতা মাত্র ৫ কিলোমিটার। বাকি তিনবারের গভীরতা ১০ কিলোমিটার। রাত ৩টা ১১ মিনিটের ৪.০, ২টা ২০ মিনিটের ৩.৯ এবং ১টা ১৫ মিনিটের ৩.১ যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। ভূতত্ত্ববিদদের বক্তব্য, প্রত্যেকদিনই পৃথিবীজুড়ে শয়ে-শয়ে ভূকম্পন হচ্ছে। সিসমোগ্রাফের উন্নতিতে ছোট ছোট কম্পনও ধরা পড়ছে। তবে উত্তরবঙ্গের অবস্থান এখন যথেষ্টই ঝুঁকিপূর্ণ। একটা সময় দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের অবস্থান ছিল ঝঁুকিপূর্ণ জোন ফোর-এ এবং জোন থ্রি (মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ)-তে ছিল উত্তরবঙ্গের বাকি এলাকাগুলি। কিন্তু বিআইএস সম্প্রতি যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে, তাতে হিমালয়ের অবস্থান দেখানো হয়েছে জোন সিক্স-এ। অর্থাৎ, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ এবং প্রাকৃতিকগত পরিবর্তনের জেরে এই অঞ্চল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঘুম ভাঙার পর কার্যত রাত জেগেছে পাহাড়। সমাজমাধ্যমে (Social Media) ধারাবাহিক পোস্টের জেরে কিছুটা হলেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। কালিম্পং হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিদ্ধান্ত সুদ বলেন, ‘হঠাৎ রাতে সমস্ত কিছু কেঁপে ওঠে। কিছুটা তো ভয় লাগবেই। তবে সকাল হওয়ার পর জানতে পারি, অনেকবার মাটি কেঁপেছে।’ সিকিমের পর্যটন ব্যবসায়ী প্রেম ভুটিয়ার বক্তব্য, ‘দু’বার টের পেয়েছি। মংগনের ভূমিকম্প এখনও মানুষ ভুলতে পারেননি। ফলে আতঙ্ক তো ছড়াবেই।’ সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট মানুষকে বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছে বলেও মনে করেন অনেকে।
