রাহুল দেব, রায়গঞ্জ: ‘অবাক হয়ে দেখত সে তাই করুণ দু’টি চোখ মেলে, তার বয়সি ওই যে কারা সেজেগুজে যায় স্কুলে? পড়েনি সে অ-আ-ক-খ অঙ্ক ধারাপাত, জন্ম থেকেই দেখছে কেবল অশান্ত ফুটপাথ’- এই দৃশ্য আমাদের যেমন চোখ এড়ায় না, তেমন হাজার চাইলেও এই দৃশ্য তারা জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। যে পথ হারানোর টানে আমরা পথে নেমে পড়ি, তারা দিন কাটায় ওই পথটুকু আঁকড়েই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন জায়গার আবর্জনায় কিছুর খোঁজ চালায়। আবার কেউ সেই আবর্জনার মধ্যে থেকেই খুঁজে নেয় নিত্যদিনের রসদ। আর ঠিক এই ভাবনাকে আর দূরে না রেখে এবার পুজোয় রায়গঞ্জের (Raiganj) সমাজ সেবক সংঘ আপন করে নিয়েছে। ‘টুকাই, মা আসছে রে! চল রে সবাই, এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য…!’ পথশিশুদের প্রতীক হিসেবে মণ্ডপে থাকা এই টুকাইরা আমাদের চেতনার প্রতিফলন।
শহরের তুলসীতলার হরিসভা মাঠে হবে এবছরের পুজো (Durga Puja 2025)। প্রতি বছর সমাজ সেবক সংঘ তাদের থিমের মাধ্যমে বিশেষ বার্তা দিয়ে থাকে। সমাজকে পুরোপুরিভাবে গ্রাস করতে শুরু করেছে বিভেদ, হিংসা, অসম্প্রীতি, স্বার্থপরতা সহ কিছু আত্মদম্ভ সুখের অভ্যাস। তাই এই সমস্ত অভ্যাসকে সমাজ থেকে পুরোপুরি সরিয়ে টুকাইদের বাসযোগ্য করে তোলার বার্তাই দেওয়া হবে এই থিমের মাধ্যমে। পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে সেগুলো থেকে শিশুরাও কিন্তু রেহাই পায়নি। সর্বগ্রাসী শক্তির কালো ধোঁয়ায় শিশুদের জীবনও বিপন্ন। তা থেকে মুক্তির বার্তাও ফুটে উঠবে এই থিমে। এবার তাদের পুজো ৬৭তম বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে। পুজো কমিটির কর্মকর্তা অচিন্ত্য সরকারের কথায়, ‘বিশেষ বার্তা দিতে চলেছি আমরা এবার। এই অশান্ত পৃথিবীতে শিশুদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এতে কোনও দ্বিমত নেই। আমাদের সমাজের ছোট ছোট আস্তাকুঁড় থেকেই দিন গুজরানের উপকরণ খুঁজে নেয় তারা। এরকম বেশ কিছু মডেল এখানে দেখানো হবে।’
রায়গঞ্জ ব্লকের রঞ্জন দে রয়েছেন মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে। পাড়ারই বাসিন্দা অমিত দাস রয়েছেন প্রতিমা বানানো আর পাশের পাড়ার বাবুল পাল রয়েছেন আলোর দায়িত্বে।
সমাজের সর্বহারাদের অন্যতম টুকাইদের নিয়ে অভিনব এই থিম মানুষের নজর কাড়বে বলে আশাবাদী পুজো কমিটি। ছোট ছোট টিনের ঘরে টুকাইদের জীবনের সংগ্রাম ফুটিয়ে তুলবেন আয়োজকরা। এত ভালো থিমের পুজোর পরেও টুকাইরা কিন্তু থেকে যাবে সেই তিমিরেই। সমাজের সব টুকাই হয়তো জানতেও পারবে না যে তাদের নিয়ে এই থিমের পুজো নাড়া দিয়েছে সকলের মনেই।
মণ্ডপশিল্পী রঞ্জন দে’র কথায়, ‘আয়োজকরা যে থিমের কথা চিন্তা করেছেন তা সত্যিই অনবদ্য। সুনিপুণভাবে মণ্ডপে সমাজের টুকাইদের ফুটিয়ে তোলা হবে। তাতে টুকাইদের আরও বেশি জীবন্ত মনে হবে দর্শনার্থীদের।’
শহরের বাসিন্দা বাপ্পাদিত্য রায় বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে ক্লাব যে থিমের পুজোগুলি করেছিল সেগুলির প্রত্যেকটিতেই সামাজিক বার্তা ছিল। এবছর পুজোতে পথশিশুদের সংগ্রাম ও তাদের বিষয়ে আশার আলো প্রদর্শন করা হবে। দেখার জন্য মুখিয়ে আছি।’
