বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, পতিরাম: নাজিরপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত বৈদুল গ্রামের চৌধুরী জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Puja 2025) যেন ঐতিহ্যের অন্য নাম। একশো পনেরো বছর ধরে চলে আসা এই পুজো আজও সাবেকিয়ানার ধারাবাহিকতায় টিকে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রক্ষিত এই রীতি শুধু জমিদার পরিবারের নয়, গোটা গ্রামের মানুষকেও এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। প্রতি বছর জন্মাষ্টমীর দিন খুঁটিপুজোর মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে চণ্ডীমঙ্গল গান, যা গ্রামের আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে। তবে এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ অষ্টমীর দিন। সেদিন পুজো শুরুর আগে আকাশে বন্দুকের গুলি ছোড়া হয়- এই প্রাচীন প্রথা আজও অক্ষুণ্ণ। অষ্টমীর দিন অন্নভোগে অংশ নেন গোটা গ্রামের মানুষ, ফলে দুর্গোৎসব পরিণত হয় বৃহৎ মিলনমেলায়।
প্রতিমা নির্মাণেও এখানে বিশেষ নিয়ম মানা হয়। এখানকার সমস্ত প্রতিমা থাকে এক কাঠামোর মধ্যে। বর্তমানে জমিদার পরিবারের শরিকেরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজোর সময় সকলে একত্রিত হন এই বাড়িতে। এই পুজো যেন পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ। পুজোর ব্যয়ভার বহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ঐতিহ্যের ছাপ। জমিদারবাড়ির মন্দিরের নামে রয়েছে প্রায় পঁয়ত্রিশ বিঘা জমি। সেই জমি থেকে অর্ধেক খরচ মেটানো হয়। বাকি অর্ধেকে খরচ মেটান সেই শরিক, যার কাঁধে সেবছরের পুজোর ভার।
ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায় প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রেও। দশমীর দিন সূর্যাস্তের পর আকাশে প্রথম তারা দেখা মাত্রই প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন শুরু হয়। এই প্রথা গ্রামবাসীর কাছে পুজোর অপরিহার্য অংশ। জমিদারবাড়ির বর্তমান উত্তরসূরি ভূদেব চৌধুরী, পুরঞ্জয় চৌধুরী ও দেবানন্দ চৌধুরীর কথায়, ‘এই পুজো আমাদের জন্য শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক উৎসবও বটে। প্রতিবছর এই উপলক্ষ্যে সবাই একত্রিত হন, একসঙ্গে সময় কাটান।’ শতাধিক বছরের এই দুর্গোৎসব শুধু এক জমিদার পরিবারের নয়, গোটা বৈদুল গ্রামের মিলিত ঐতিহ্য। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু চৌধুরীবাড়ির দুর্গাপুজোর সাবেকিয়ানা আজও এক বিন্দুও বদলায়নি।
