বরুণকুমার মজুমদার, করণদিঘি: রাজ আমলে শুরু হয়েছিল ডুমরাডাঙ্গির কালীপুজো। ১৪০ বছর ধরে রাজ পরিবারের রীতি মেনে পুজো হয় এখানে। আজও এখানে দিনের আলোয় মায়ের পুজো হয়। কথিত আছে একসময় রাজপুরোহিত নিজের শরীরের রক্ত মায়ের উদ্দেশে নিবেদন করতেন।
এই পুজো মূলত শুরু করেছিলেন অধুনা বিহারের পূর্ণিয়ার রাজা পৃথ্বীচান্দ চৌধুরী। সেই সময় মায়ের পুজো করতেন রাজপুরোহিত মুনজীর। কলাপাতায় পুজোর প্রসাদ ও অন্যান্য সামগ্রী সাজানো হত। পৃথ্বীচান্দ প্রয়াত হওয়ার পর তাঁর বংশধররা বংশানুক্রমে পুজো করতেন। ইংরেজ শাসনকালে রাজবংশের ক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকে। ধীরে ধীরে এই পুজো বন্ধ হয়ে যায়।
এই রাজপরিবারের সঙ্গে সখ্য ছিল ডুমরাডাঙ্গির লালকিশোর সিংহের। পুজো বন্ধ হওয়ার কয়েক বছর পর এক রাতে তিনি মায়ের স্বপ্নাদেশ পান। তারপর শ্যামা মায়ের পুজো শুরু হয় ডুমরাডাঙ্গিতে। রাজা পৃথ্বীচান্দের বংশধররা মন্দিরের জন্য চল্লিশ একর জমি দান করেন লালকিশোরকে। বর্তমান সময়ে লালকিশোরের বংশধর আশুতোষ সিংহ নিজের হাতে মায়ের মূর্তি বানিয়ে পুজো করেন। তিনি পুজোর পৌরোহিত্য করেন। প্রতিমা তৈরি হওয়ার পর নিশুতি রাতে মায়ের প্রতিমা ধানখেতের মধ্যে দিয়ে ডুমরাডাঙ্গি থেকে এক কিমি দূরে জুঝারপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পরের দিন সেখানে রাজপরিবারের দান করা জমিতে তৈরি মন্দিরে দিনের আলোয় মায়ের পুজো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা পবন সিংহ বলেন, ‘ধানখেতের মধ্যে দিয়ে আমরা মায়ের মূর্তি নিয়ে যাই। কিন্তু ধানের কোনও ক্ষতি হয় না। বরং যেই জমির মধ্যে দিয়ে মা যান সেই জমিতে ফলন ভালো হয়।
আশুতোষ জানান, রাজপরিবারের রীতি মেনে মহালয়ার দিন থেকে এই প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। রাজ আমল থেকে কলার পাতায় মা কালীকে ভোগ দেওয়া হয়। আগে ১০১টি পাঁঠাবলি দেওয়া হত। পুজোর পর গ্রামের মানুষের মধ্যে মিষ্টি, নাড়ু বিতরণ করা হত। এখনও এখানে পশুবলি দেওয়া হয়। আগে রাজবংশের লোকজন এই পুজো উপলক্ষ্যে ডুমরাডাঙ্গিতে আসতেন। তবে এখন আর কেউ আসেন না।
তিনি আরও জানান, মায়ের মন্দির নির্মাণের জন্য যেমন রাজপরিবারের পক্ষ থেকে জমি দান করা হয়েছিল। তেমনি যে সেই সময় প্রতিমা নির্মাণ করতেন তাঁকে নয় বিঘা, যিনি পাঁঠাবলি দিতেন তাঁর পরিবারকে ষোলো বিঘা জমি দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গ্রামের মানুষ আজও এই পুজোয় নানাবিধ সাহায্য করেন।
প্রচলিত বিশ্বাস যে এখানে মা কালী খুব জাগ্রত। তাই মায়ের কাছে পুজো দিতে বাইরে থেকে প্রচুর ভক্তরা আসেন। সারারাত জেগে গ্রামবাসী মায়ের আরতি, মহাভারত পাঠ, রামায়ণ পাঠ সহ সুরানি গান করেন। পুজো উপলক্ষ্যে এলাকায় দু’দিনব্যাপী মেলা বসে।
