Dooars Air pollution | বিষ-ধোঁয়ায় বিপন্ন নীল নির্জন, ডুয়ার্সের বুকে ধেয়ে আসছে দূষণের থাবা

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


নাগরাকাটা: ডুয়ার্স মানেই তো চোখের আরাম। চা বাগানের সবুজ গালিচা আর নীল আকাশের মাঝে উঁকি দেওয়া পাহাড়। কিন্তু সেই সবুজের বুকেই এখন জমছে কালচে বিষাদ। ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর জলে মিশে থাকা ডলোমাইট ডুয়ার্সের বনাঞ্চল আর বিস্তীর্ণ চা বলয়ের বুকে ইতিমধ্যেই দগদগে ক্ষত তৈরি করেছে। এবার সীমানার ওপার থেকে ভেসে আসছে কারখানার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া (Dooars Air pollution)। যে ডুয়ার্সের বিশুদ্ধ বাতাস প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে শেখায়, সেই ডুয়ার্সেরই আজ দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রকৃতির এই নীরব কান্নায় শুধু যে এখানকার আর্থিক মেরুদণ্ড— পর্যটনশিল্প ভেঙে পড়ছে তা নয়, বিষাক্ত বাতাসে তিলে তিলে নিঃশেষ হতে বসেছে সাধারণ মানুষের প্রাণশক্তি, ঘনিয়ে আসছে মারাত্মক সব রোগভোগের কালো ছায়া।

ভুটান সীমান্তঘেঁষা ডুয়ার্সের একচিলতে স্বর্গের নাম লালঝামেলা বস্তি। ভুটানের সামচি জেলার ধামধুমের ঝরনা থেকে জন্ম নেওয়া উপলমুখর ডায়না নদী এখানে যেন আপন খেয়ালে গান গায়। এই নীল নির্জনে দু’দণ্ড শান্তির খোঁজে, শীত কি গ্রীষ্ম, সারাবছরই ভিনরাজ্য থেকে শুরু করে আমাদের রাজ্যের হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন। পিকনিক বা ‘ডে-ভিজিট’-এর জন্য লালঝামেলা বরাবরই পর্যটকদের বড় আদরের। আর এই আগন্তুকদের মুখের হাসিতেই লুকিয়ে থাকে এলাকার হতদরিদ্র মানুষগুলোর বেঁচে থাকার রসদ। পর্যটকদের আনাগোনাই যে তাঁদের রুটিরুজির একমাত্র অবলম্বন।

কিন্তু সেই চেনা ছবিটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশে এখন বেলাগাম শিল্পায়নের জোয়ার। পাহাড় ফাটিয়ে একের পর এক কলকারখানা মাথা তুলছে সেখানে। আর সেই কারখানার চিমনি থেকে বেরোনো ধোঁয়ায় লালঝামেলার সকালগুলো এখন আর শিশিরভেজা থাকে না, ঢেকে থাকছে ঘন কালো ধোঁয়াশায়। একটু হাওয়া দিলেই সেই বিষাক্ত বাতাস ঢুকে পড়ছে গ্রামের কুঁড়েঘরগুলোতে। দূষণে চোখজ্বালা, শ্বাসকষ্টের মতো শারীরিক অস্বস্তি শুরু হওয়ায় পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। নাগরাকাটার বাসিন্দা আশিস ছেত্রীর কথায় ঝরে পড়ে একরাশ আক্ষেপ, ‘ক’দিন আগেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই পুরোনো নির্মল বাতাস আর পেলাম না। দমবন্ধ করা ধোঁয়ায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতেই পারিনি।’ লালঝামেলা বস্তির বাসিন্দা দিবস শর্মার গলায় মিশে থাকে চরম অসহায়তা, ‘পর্যটকরা তো দূরের কথা, ধোঁয়ায় আমাদেরই তো গ্রামে বেঁচে থাকা দায় হয়ে উঠেছে।’

লালঝামেলা বস্তি তো একটা ছোট্ট আয়না মাত্র। ভুটানের এই অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে বীরপাড়া থেকে নাগরাকাটা পর্যন্ত ডুয়ার্সের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে। সীমান্তের ওপারে ডায়না, মেচেটার, চৈলিকুপের মতো জায়গাগুলোতে রাতদিন চলছে পাহাড় ভাঙার খেলা আর কারখানার দূষণ। লালঝামেলা থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরের ধরণীপুর চা বাগানের স্কুল শিক্ষক ধীরাজ সিং বলছিলেন, ‘আমাদের এখান থেকেই সারাদিন ওই কালো ধোঁয়া দেখা যায়। তাতেই বোঝা যায় সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোর কী করুণ অবস্থা।’

ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির তরফে সাধারণ সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব এই নষ্ট হতে বসা নিসর্গ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রকৃতি তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল ডুয়ার্সকে। অথচ আজ সেই প্রকৃতিই কাঁদছে। প্রশাসনিক স্তরে দুই দেশের সরকার এখনই কোনও উদ্যোগ না নিলে, ডুয়ার্সের এই সবুজ পর্যটনকেন্দ্রগুলো হয়তো একদিন শুধুই স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। আর পেছনে ফেলে যাবে একদল দিশেহারা, অসুস্থ আর রুটিরুজি হারানো অসহায় মানুষকে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *