শুভঙ্কর চক্রবর্তী, দার্জিলিং: গোধূলির আলো তখন ম্যালকে এক মায়াবী উৎসবে রাঙিয়ে দিয়েছে। ফোয়ারার কাছে একগুচ্ছ রংবাহারি বেলুন ঘিরে কচিকাঁচাদের হুটোপাটি যেন এক টুকরো চলমান রামধনু। কবি ভানুভক্তের মূর্তির সামনে সেলফিতে মেতেছেন নবীন থেকে প্রবীণ সকলেই। বাতাসে ভাসছে ঝলসানো ভুট্টার গন্ধ আর লেমন-টি ও কফির চেনা সুরেলা হাঁক। এরই মাঝে গরম পোশাকের দোকানে একদল মহিলার দরদামের মৃদু গুঞ্জন আর হাসির হিল্লোল এক জীবন্ত জলছবি তৈরি করেছে। খানিক দূরে দোতলার ক্যাফের এক কোণে বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন সল্টলেকের বছর তিরিশের তরুণ প্রদীপ্ত ধর। সামনে টেবিলে খোলা ল্যাপটপ, পাশে কফির কাপ আর স্যান্ডউইচ। আপন মনে কাজ করে যাচ্ছেন আর মাঝে ম্যালের দিকে তাকিয়ে থাকছেন।
মৃদুভাষি প্রদীপ্ত লন্ডনের একটি বেসরকারি সংস্থায় ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ করেন। তাঁর কাজের জন্য আলাদা অফিস দরকার নেই। ল্যাপটপ আর হাইস্পিড ইন্টারনেট হলে পছন্দের যে কোনও জায়গায় বসেই কাজ করা যায়। ওই অনেকটা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর মতো ব্যাপার। বিশ্বজুড়ে প্রদীপ্তদের অবশ্য একটা পোশাকি নাম রয়েছে, ‘ডিজিটাল নোম্যাড’ (Digital Nomads)। প্রদীপ্ত জানালেন, দার্জিলিংয়ে (Darjeeling) এক মাস থাকবেন। অফিসের কয়েকটা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে ফিরে যাবেন। কাজের জন্য মানসিক স্থিরতা দরকার, তাই পাহাড়ে এসেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু প্রদীপ্ত একা নন, তাঁর মতো হাজারো ডিজিটাল নোম্যাড-এর পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রিয় শৈলশহরটি।
প্রদীপ্তদের দৌলতে পাহাড়ের গাম্ভীর্য এক নতুন বিবর্তনের সাক্ষী। যে শহরটিকে আমরা কুয়াশা আর ব্রিটিশ স্থাপত্যের ভিড়ে কেবল কয়েকদিনের ছুটি কাটানোর আস্তানা হিসেবে চিনতাম, সেই দার্জিলিং আজ নীরবে রূপান্তরিত হয়েছে এক বিশাল ‘অফিস-কাম-হোম’-এ। পর্যটনের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রদীপ্তর মতো পেশাদাররা আজ হিমালয়ের কোলকে বেছে নিচ্ছেন কর্মক্ষেত্র হিসেবে। শৈলরানি এখন মেঘেদের সঙ্গে ল্যাপটপ ভাগ করে নেওয়ার এক সৃজনশীল ঘরসংসার।
আগে পর্যটনের ছক ছিল বাঁধা- টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখা, ম্যাল রোডে ঘোরাঘুরি আর কিছু কেনাকাটা সেরে সমতলে ফেরা। কিন্তু ডিজিটাল যুগের এই যাযাবররা সেই চেনা ছকটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। তাঁরা এখানে ছুটি কাটাতে আসেন না, আসেন জীবনকে পাহাড়ের ছন্দে মিলিয়ে দিয়ে কাজ করতে। হাইস্পিড ইন্টারনেট আর ল্যাপটপকে সম্বল করে প্রদীপ্তরা প্রমাণ করছেন যে, রুজিরুটির জন্য এখন আর মহানগরের যান্ত্রিক খাঁচায় বন্দি থাকার প্রয়োজন নেই। এই পরিবর্তনের হাত ধরেই দার্জিলিংয়ের ব্রিটিশ বাংলো থেকে শুরু করে নির্জন হোমস্টেগুলো হয়ে উঠছে আধুনিক কর্পোরেট দপ্তরের বিকল্প। যেখানে জানলা খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্রতা স্বাগত জানায়, যেখানে কাজের ক্লান্তিও যেন পাহাড়ি ঝোরার মতো অনায়াসে বয়ে যায়।
প্রযুক্তি মানুষকে একসময় ঘরবন্দি করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার করে মানুষ আজ প্রকৃতির অন্দরমহলে নিজের ডেক্স সাজিয়ে নিচ্ছে। এই বিবর্তনের মূলে রয়েছে মানসিক প্রশান্তির খোঁজ। ইট-কাঠ-পাথরের শহরে এসির কৃত্রিম বাতাসে বসে যখন সৃজনশীলতা শুকিয়ে যায়, তখন পাহাড়ের বিশুদ্ধ অক্সিজেন আর পাইন বনের ধ্বনি হয়ে ওঠে টনিক। ডিজিটাল নোম্যাডরা দার্জিলিংয়ের পর্যটনকে এক নতুন স্থায়িত্ব দিয়েছেন। আগে যেখানে পর্যটন ছিল কেবল নির্দিষ্ট মরশুমের ওপর নির্ভরশীল, এখন সেখানে বারো মাসই এই ডিজিটাল কর্মীদের আনাগোনা। মেঘলা বর্ষায় যখন পর্যটকরা ভয়ে পাহাড় এড়িয়ে চলেন, তখনও কোনও এক ক্যাফেতে বসে নিবিষ্ট মনে কাজ করে যান এই নতুন প্রজন্মের কর্মীরা। তাঁদের কাছে পাহাড়ের নির্জনতাই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এই সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তির কর্মস্পৃহা বাড়াচ্ছে না, বরং পাহাড়ের স্থানীয় অর্থনীতিতেও এক দীর্ঘমেয়াদি স্থিরতা আনছে। হোটেল বা হোমস্টে মালিকরাও আজ পর্যটকদের জন্য কেবল গদিওয়ালা বিছানা নয়, বরং ভালো ওয়াই-ফাই আর এক চিলতে বারান্দার ব্যবস্থার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন।
আমাদের হোটেল থেকেই খবর মিলল লেবং কার্ট রোডের একটি হোমস্টে’র, তুলনায় কম খরচে থাকা-খাওয়ার সঙ্গে অসাধারণ সৌন্দর্য দেখার সুযোগ মেলে ওই হোমস্টে থেকে। ডিজিটাল নোম্যাডদেরও ভীষণ পছন্দ ওই হোমস্টে। ছিমছাম হোমস্টে’র ব্যালকনিতে কাজের জন্য চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। বাড়ির মালিক প্রকাশ সুব্বার কথা, ‘বছর দেড়েক আগে একবার দিল্লি থেকে একটি মেয়ে এসে দেড় মাস ছিল। ওর আবদারেই ব্যালকনিতে টেবিল-চেয়ার পেতেছিলাম। ও খেত আর ল্যাপটপে কাজ করত। একটি মেয়ে কেন এতদিন থাকছে ভেবে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। পরে আমার এক ভাইপো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছে। এখন অনেকেই আসছেন। কেউ দশদিন, কেউ এক মাস থাকছেন। অফ সিজনেও ওঁরা আসেন।’
তবে পর্যটনের এই বিবর্তনকে স্থায়িত্ব দিতে প্রয়োজন প্রশাসনিক দূরদর্শিতা। বর্তমানে জিটিএ বা পর্যটন দপ্তরের খাতায় ডিজিটাল নোম্যাডদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও নীতি নেই। পাহাড়ের অর্থনীতিতে এই নতুন জোয়ারকে ধরে রাখতে গেলে সাবেকি পরিকাঠামোর খোলস ত্যাগ করা জরুরি বলেই মনে করছেন ডিজিটাল নোম্যাডরা। গ্লেনারিজের বারান্দায় বসে কথা হচ্ছিল খড়্গপুরের প্রীতম জানার সঙ্গে। কনটেন্ট রাইটার প্রীতমের কথা, ‘‘যেখান থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় হোটেলের এমন ঘর বা হোমস্টেগুলিই আমাদের বেশি পছন্দ। হোমস্টেগুলিতে হাইস্পিড ইন্টারনেট এবং লোডশেডিংহীন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিশ্চিত করলে পাহাড়ে ডিজিটাল নোম্যাডদের ভিড় নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রশাসনকে কাজের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই দার্জিলিং হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘রিমোট ওয়ার্ক ডেস্টিনেশন’।’’
পর্যটকদের পরিষেবা প্রদানকারী সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যালের বক্তব্য, ‘দার্জিলিং ও পার্শ্ববর্তী এলাকাকে হাইস্পিড ইন্টারনেট জোন হিসাবে ঘোষণা করে পরিকাঠামো উন্নত করতে সুনির্দিষ্ট নীতি জরুরি। কেন্দ্রীয় সরকারের এব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া দরকার। সেটা হলে ডিজিটাল নোম্যাডদের হাত ধরে দার্জিলিংয়ের পর্যটন মানচিত্র বদলে যাবে।’ জিটিএ’র চিফ এগজিকিউটিভ অনীত থাপা জানিয়েছেন, ডিজিটাল নোম্যাডদের জন্য তাঁরা আলাদা নীতির কথা ভাবছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘পর্যটনকে বাঁধাধরা গণ্ডি থেকে বের করার চেষ্টা করছি আমরা। প্রত্যন্ত এলাকায় হাইস্পিড ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়ে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য নানা পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।’
