উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাস, নাকি কোনো এক ভৌতিক আক্রোশ? যে বন্য হাতির হাত থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ছেড়ে নদী পেরিয়ে মাইলের পর মাইল দূরে পালিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা, দীর্ঘ ১৪ বছর পর সেই একই হাতি নদী পেরিয়ে এসে তাঁদের নতুন ডেরায় হানা দিল। কেড়ে নিল পরিবারের আরও দুই সদস্যের প্রাণ। নেপালের চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের (Chitwan Nationwide Park) কুখ্যাত বন্য হাতি ‘ধুরবে’ (Dhurbe)-র এমন ভয়ঙ্কর জেদ ও হিংস্রতা দেখে স্তব্ধ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আমজনতা।
নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই বন্য হাতিটি এ পর্যন্ত অন্তত ২৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আর তার শিকার হওয়া ২৫ জনের মধ্যে ৪ জনই হলেন একই পরিবারের সদস্য!
শনিচরা বোটে (Shanichara Bote)-র জন্য এই দুঃস্বপ্নের শুরু হয়েছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে।নেপালের চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা মাডি (Madi) নামক শহরে রাতের অন্ধকারে হানা দেয় বুনো হাতি ‘ধুরবে’।শনিচরার চোখের সামনেই তাঁর বাবা এবং মাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে হাতিটি।
বাবা-মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়া শনিচরা সিদ্ধান্ত নেন, এই বুনো হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচতে হলে জঙ্গল সংলগ্ন এলাকা থেকে বহুদূরে চলে যেতে হবে। নিজের পরিবারকে নিয়ে প্রায় ৯ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে, খরস্রোতা রাপ্তি নদী (Rapti River) পেরিয়ে জগতপুর (Jagatpur) এলাকায় এসে নতুন করে বসতি গড়ে তোলেন তিনি। শনিচরা ভেবেছিলেন, চওড়া রাপ্তি নদী পেরিয়ে ওই হাতি কোনোদিন আর তাঁদের খোঁজ পাবে না। কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
দীর্ঘ ১৪ বছর শান্তিতেই কেটেছিল জগতপুরের নতুন ডেরায়। কিন্তু সম্প্রতি এক মাঝরাতে আচমকাই সেই যমদূত ফিরে আসে। অন্ধকারে ঘরবাড়ি ভেঙে তাণ্ডব চালাতে শুরু করে ধুরবে। শনিচরার ২৫ বছর বয়সী পুত্রবধূ আশিকা বোটে তাঁর চার বছরের ছোট্ট ছেলে ভরত বোটে-কে কোলে নিয়ে প্রাণভয়ে বাইরে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু উঠোনে ওত পেতে থাকা ধুরবে তাঁদের ধরে ফেলে এবং পায়ের তলায় পিষে দেয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মা ও ছেলের।
কান্নায় ভেঙে পড়ে শনিচরা বোটে সংবাদমাধ্যমকে বলেন: “আমরা ভেবেছিলাম বড় নদীটা পেরিয়ে ওপারে চলে গেলে বোধহয় রক্ষা পাব। কিন্তু এত বছর পর সেই একই হাতি আমাদের খুঁজে বের করল! আমাদের ঘরে ঢুকে আমার পুত্রবধূ আর ছোট্ট নাতিটাকে কেড়ে নিল। আমাদের আর পালানোর কোনো জায়গা রইল না।”
নেপালের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও কুখ্যাত বন্য হাতি হিসেবে পরিচিত এই ধুরবে। ইন্টারনেটে তার নামে একটি আস্ত উইকিপিডিয়া পেজও রয়েছে, যেখানে তার দ্বারা ঘটে যাওয়া একের পর এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নথিভুক্ত আছে।
চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের আধিকারিকরা জানান, ধুরবের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বন্যপ্রাণী বিভাগ বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে।
- ২০১৬ সালে প্রথমবার তাকে বন্দি করে ট্র্যাকিং কলার (রেডিও কলার) পরানো হয়েছিল।
- সেই কলার অকেজো হয়ে যাওয়ার পর ২০২০ সালে দ্বিতীয়বার কলার দেওয়া হয়।
- ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার কলার পরানো হয় তার গলায়, যা প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর তার লোকেশন পাঠাতে থাকে।
কিন্তু এত নজরদারি সত্ত্বেও কোনো এক রহস্যময় কারণে সে আবার সেই বোটে পরিবারের দরজাতেই এসে হানা দিল, যা মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।

