আব্দুল লতিফ, গয়েরকাটা: একটা সময় ছিল যখন ধূপগুড়ি (Dhupguri) মহকুমার রাভা বস্তি, মেলা বস্তি, খুকলুং বনবস্তিতে ঢুকলেই তাঁত বোনার খটখট আওয়াজ শোনা যেত। দিনভর রাভা (Rabha) জনজাতীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক কালাই পাকাড়, মেখলা চাদর বানাতে ব্যস্ত থাকতেন রুবিলা রাভা, বনতি রাভারা।
তবে হাল ফ্যাশনে হারিয়ে যেতে বসেছে সেসব পোশাক। চাহিদা না থাকায় সেভাবে বরাতও পান না শিল্পীরা। ফলে সংসার চালাতে বিকল্প কাজ খুঁজে নিয়েছেন তাঁরা। এই যেমন খুকলুং বস্তির তাঁত শিল্পী বনতি রাভা বর্তমানে এলাকার একটি বিউটি পার্লারে কাজ করছেন। তাঁর কথায়, ‘পুজোপার্বণ আর বিয়ে ছাড়া বাকি সময়ে রাভাদের ঐতিহ্যবাহী এই পোশাকের ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। তার ওপর বাইরে থেকে পোশাক এনে ব্যবসা করছেন এক শ্রেণির মানুষ। বছরে যে কয়েকটা পোশাক তৈরির বরাত পাই সেটা তৈরি করে দিই। তবে এতে সংসার চলে না। তাই অন্য কাজ করতে হচ্ছে।’ এক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
এ ব্যাপারে রাজ্য রাভা ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের রাজ্য সম্পাদক রবি রাভা বলেন, ‘এটা স্বীকার করতে কোনও আপত্তি নেই যে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী পোশাক ব্যবহারের আগ্রহ হারাচ্ছে যুব সমাজ। কোচবিহার,আলিপুরদুয়ার সহ বিভিন্ন রাভা অধ্যুষিত এলাকায় প্রশিক্ষক দিয়ে ওই ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি পোশাক ব্যবহারের জন্য সকলকে সচেতন করা হচ্ছে।’
আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই সব পোশাকের ব্যবহার অনেকাংশে কমতে বসেছে। তার ওপর এতদিন বাইরে থেকে সুতো কিনে এনে এলাকার শিল্পীরাই ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরি করতেন। কিন্তু বর্তমানে ওই পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং সুতোর দাম বৃদ্ধিতে ক্ষতির মুখ পড়ছেন শিল্পীরা।
তাঁরা জানিয়েছেন, পুজোপার্বণের সময় এলাকায় ঢুকে পড়ছে অসমের তৈরি ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক। তুলনামূলকভাবে কম দামে মেলায় সেই পোশাক কিনছে অনেকে। যার ফলে আগেকার মতো আর চাহিদা নেই গ্রামীণ তাঁতে তৈরি ওই পোশাকের। বাধ্য হয়ে পুরোনো পেশাকে ছেড়েছেন অনেকে।
বছরের যে কয়েকটা পোশাক তৈরির বরাত পাই তাতে পোশাক তৈরির যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণের খরচটাই ওঠে না। তাই কাজে আর আগ্রহ পাই না বলে জানিয়েছেন রুবিলা। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা মেখলা, কালাই পাকাড় পোশাক বিক্রির স্থায়ী বাজার তৈরির দাবি তুলেছেন।
রাভা বস্তির ভূমিপুত্র তথা রবি ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলী’ র রাভা ভাষার অনুবাদক ভবেন্দ্র রাভা বলেন, ‘ঐতিহ্যকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পোশাককে ধরে রাখতে গেলে প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের আগ্রহ। এক্ষেত্রে সরকারের অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। রাভা তাঁত শিল্পীদের ভাতার ব্যবস্থা সহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে হয়তো ঐতিহ্য বাঁচবে।’
