অরুণ ঝা, ইসলামপুর: শীত যেন গিয়েও যাচ্ছে না বিহার-বাংলার সীমানা থেকে। তবে, কুয়াশা আর নেই। তাই মাথার উপর নিকষ কালো আকাশে তারা ফুটছে এক এক করে। অন্ধকার নিস্তব্ধ গ্রামে দূর থেকে একটা কুকুরের আর্তনাদ ভেসে এল।
বেফাঁস প্রশ্নটা করে বসেছিলাম- আচ্ছা আপনারা তো বিহার-বাংলা দু’জায়গাতেই কাজ করেন। বিহারের আর্মস মাফিয়াদের সঙ্গে বাংলার কোন কোন নেতার দহরম-মহরম রয়েছে? প্রশ্ন শুনে আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েকজনও একঝলক তাকালেন আমার দিকে।
‘জ্যাদা গহরাই মে জানে কী কোশিস মত কর, খুদ কো হি ঢুন্ডতে রহে জায়োগে।’- হিমশীতল গলায় আমার সীমানা বেঁধে দিলেন স্যরজি। হঠাৎ শরীরটা কেঁপে ওঠে। শীতে না ভয়ে, বুঝতে পারি না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন স্যরজি। তারপর বাংলায় বললেন, ‘নাম বলতে পারব না। তবে রুটটা বলে দিচ্ছি তোমায়।’
বিহারের মুঙ্গের জেলা তো আগ্নেয়াস্ত্রের কারবারে আগে থেকেই কুখ্যাত। আজও মুঙ্গেরের অস্ত্র এই এলাকা দিয়ে বাংলায় ঢোকে। তবে নতুন করে উঠে আসছে বেগুসরাই, মুজফফরপুর, পাটনা, গয়া, আরারিয়ার নাম। চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, ইসলামপুর লাগোয়া বিহারের কিশনগঞ্জ জেলার বাংলা সীমানাতেও আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হচ্ছে। বিহারের দূরের জেলা থেকে বাসে, ট্রেনে মহিলা ক্যারিয়ার দিয়ে চলছে অস্ত্রের পাচার। এখানে এসেছি যার সূত্র ধরে সেই বলেছিল, বাংলা আগ্নেয়াস্ত্রের বড় মার্কেট। উত্তর-পূর্ব ভারতও। তাই বাংলার যত কাছে আর্মসের কারখানা খোলা যায় তত সুবিধা হয়।
বাংলার বাজার এতই ভালো যে উত্তরপ্রদেশ থেকে বিহার হয়ে ইসলামপুর মহকুমায় ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। ইসলামপুর পুলিশ জেলার ‘স্টক পয়েন্ট’ থেকে সেই অস্ত্র বরাতমতো পৌঁছে যাচ্ছে দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার হয়ে কোচবিহার জেলা পর্যন্ত। গত পঞ্চায়েত ভোটের পর ইসলামপুরের এক বাহুবলী নেতা হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ধরে নিন এটা আমাদের ‘দুয়ারে রসদ’।
বিহারের আরারিয়া ও পূর্ণিয়া হয়ে অস্ত্রের (Arms) অন্যতম সাপ্লাই পয়েন্ট বাংলার ডালখোলা (Dalkhola)। নতুন রুট হিসাবে আরারিয়া, মুঙ্গের থেকে আর্মস কনসাইনমেন্ট চলে আসছে ধরমভিটা হয়ে সোনাপুর। তারপর গোয়ালপোখরের পাঞ্জিপাড়া, চোপড়া থেকে দার্জিলিং জেলার বিধাননগর। আমর্স হাতবদলের সাপ্লাই চেনটা এইরকমই। আর এই সাপ্লাই চেন নিয়ন্ত্রণ করে অত্যন্ত দক্ষ ডিলাররা। ক্রেতা কেমন, বুঝে নিয়ে অস্ত্র সাপ্লাইয়ের জন্য পাঠানো হয় কখনও বিলাসবহুল গাড়ি, আবার কখনও টোটো, যাতে হাতবদলের সময় ঘুণাক্ষরেও কারও সন্দেহ না হয়।
বিহারের অস্ত্রের কোয়ালিটি কেমন? মানে, অপারেশন করার সময় যদি মেশিন কাজ না করে? রাজনৈতিক এলাকা দখলের জন্য অস্ত্র মজুত করেন ইসলামপুরের এক নেতা কিছুটা আক্ষেপ করে বললেন, ‘দেখুন না, আমার টিমের প্রায় ১২ লাখ টাকার আর্মস নষ্ট হয়ে গেল। বড় লোকসান। আসলে দেশি মেশিন তো। এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। আবার নতুন করে অর্ডার দিতে হবে।’ মুখে যাই বলুন, আর্মস কেনাবেচায় এই ক্ষতিটাকে তাঁরা খুব একটা গায়ে লাগান না। এলাকা শাসনে এটা ‘ইনভেস্টমেন্ট’, নেতার বডি ল্যাঙ্গুয়েজই তা বলে দিল।
ওই নেতাই বললেন, ‘এখন তো আর্মস কারখানার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। ওরা খুব ব্যস্ত। না হলে কথা বলিয়ে দিতাম।’
‘কেন ব্যস্ত?’ প্রশ্ন শুনে কিছুটা অবাক হলেন নেতা। বললেন, ‘আরে এ বছরে বিহারে বিধানসভা চুনাহ, পরের বছর বাংলায় বিধানসভা চুনাহ। এখন বাজার খুব তেজি। কারও সময়ই নেই আপনার সঙ্গে কথা বলার।’
বিহার-বাংলা সীমানায় বিস্তীর্ণ এলাকা আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সৌজন্যে এন্ট্রি মাফিয়াদের দাপট, গবাদিপশুর লাইন ক্লিয়ার আর ভোটের জন্য ‘ডিমান্ড’ তো আছেই।
(চলবে)
